অন্য চোখে

অনিরুদ্ধ বড়ুয়া ধ্রুব (১৩), কুমিল্লা

Published: 2016-07-30 21:51:50.0 BdST Updated: 2016-07-30 21:52:50.0 BdST

পাঠ্যবইয়ে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিষয়ে পড়েছি, ২০০৯ সালে চীন দেশে এক দম্পতি কম্পিউটার গেইমে আসক্তির ফলে টাকার জন্য নিজের সন্তান বেচে দেন।

তারা তাদের তিনজন ছেলেমেয়েকে ভিন্ন ভিন্ন সময়ে আনুমানিক ন'হাজার ডলারে বেচে দিয়েছিলেন। এই টাকা দিয়ে তারা তাদের এমএমও (ম্যাসিভলি মাল্টিপ্লেয়ার অনলাইন) নামে এক ধরনের কম্পিউটার গেইম খেলতেন।

তাদের দুজনেরই এমএমও খেলার প্রতি তীব্র আসক্তি ছিল।

কম্পিউটার গেইম সাধারণত দুই ধরনের হয়। এক ধরনের গেইম আছে যেগুলোতে একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্য থাকে। যেমন- কোনো রাজকন্যাকে উদ্ধার করা, মোটরসাইকেল বা কার রেসে প্রথম হওয়া, সর্বোচ্চ পয়েন্ট অর্জন করা, কম সময়ের মধ্যে একটি কাজ শেষ করা। এগুলোতে কয়েকবার টার্গেটে পৌঁছতে পারলে ঐ গেমের প্রতি আসক্তি কমে আসে।

আর আরেক ধরনের গেইম আছে যেগুলো একসাথে অনেক জন মিলে অনলাইনে খেলা যায়। এই গেইমগুলোই এমএমও গেইম। এগুলোই বেশি আসক্তি তৈরি করে। কেননা এই গেইমগুলোর কোনো শেষ থাকে না।

ওই দম্পতি এমনই একটি গেইমে জড়িয়ে পড়েন। এমএমও ধরনের গেইমগুলোতে খেলোয়াড় একটি অনলাইন চরিত্রে পরিণত হয় এবং অন্য খেলোয়াড়দের সাথে সম্পর্ক গড়ে তোলে। এখান থেকে বের হওয়া কঠিন।  

এই ভিডিও গেইমগুলো যারা বানায় তাদের উদ্দেশ্য থাকে মুনাফা লাভ করা। যতবার গেইমগুলো খেলা হবে তাদের তত লাভ হবে। এ জন্য তারা এগুলোতে বিভিন্ন আকর্ষণীয় ফিচার রাখে যা মানুষকে উৎসাহিত করে।

আসক্ত হয়ে সারাক্ষণ তারা এটা নিয়েই ভাবতে থাকে। কীভাবে সর্বোচ্চ পয়েন্ট অর্জন করবে, কেমন করে তার প্রতিযোগীকে হারাবে। গেইমের প্রতিটি ঘটনা তার মাথায় ঘুরতে থাকে। সে যখন খেলা বন্ধ করে অফলাইন থাকে তখনও ভাবতে থাকে তার কোন প্রতিযোগী মনে হয় তাকে ছাড়িয়ে চলে গেল।  সে যখন গেইমটি খেলতে বসে তখন তার মাঝে এক ধরনের অস্বাভাবিক উত্তেজনা কাজ করে। এর ফলে পড়ালেখাসহ রোজকার কাজে ব্যাঘাত ঘটে। এ ছাড়াও সে শারীরিক ও মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত হয়।

খেলার সময় অতিরিক্ত সময় ধরে মাউস ও কি-বোর্ড ব্যবহারের ফলে কার্পাল টানেল সিন্ড্রোম নামের এক প্রকারের কব্জির প্রদাহজনিত রোগ হতে পারে। রোগের প্রথম দিকে কব্জির ব্যায়াম দ্বারা এ রোগের উপশম হয়। তবে মারাত্মক আকার ধারণ করলে অস্ত্রোপচারও করতে হয়।

এছাড়া দীর্ঘ সময় ধরে অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে খেলার জন্য চোখ ও মস্তিষ্কের ওপর চাপ পড়ে মাইগ্রেনের ব্যথা হয়। গেইমের ঘটনাগুলো খেলোয়াড়ের মস্তিষ্ককে তাড়িত করে। ফলে অনিদ্রা, ঘুমের সময় হাত-পায়ের ঝাঁকুনি, হাঁটা বা কথা বলা এমনকি দুঃস্বপ্ন দেখাসহ বেশ কিছু ঘুম সংক্রান্ত রোগ হতে পারে। দীর্ঘ সময় ধরে বসে থেকে খেলার ফলে পিঠে ব্যথাও হতে পারে।

গেইমে আসক্ত হয়ে ঠিকমতো গোসল করা, দাঁত মাজা, ঠিক সময়ে খাবার খাওয়া ইত্যাদি না করার ফলে শারীরিক দুর্বলতা, অবসাদগ্রস্ততাসহ বিভিন্ন রোগের জন্ম দিতে পারে। এছাড়াও অতিরিক্ত গেইম খেলা চোখ ও কানের সমস্যা তৈরি, ঘাড়ে ব্যথা, কনুইতে ব্যথা, মূত্রের বেগ ধারণের অক্ষমতার জন্ম দেয়। শারীরিক সমস্যার পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক সমস্যাও তৈরি করে।

এই সমস্যাগুলো স্বল্প বা দীর্ঘমেয়াদি হতে পারে। মাত্রাতিরিক্ত গেইম আসক্তি মৃত্যুরও কারণও হতে পারে।

কোরিয়ায় এক লোক টানা পঞ্চাশ ঘন্টা করে কম্পিউটার গেইম খেলতেন। একদিন তিনি খেলতে খেলতেই মারা গেলেন।

যে কোনো আসক্তি থেকে বাঁচার উপায় হলো তার ক্ষতিকর দিকগুলো নিয়ে চিন্তা করা এবং ঐ কাজ থেকে ফিরে আসার জন্য দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হওয়া।

ভিডিও গেইম বেশি না খেলে ভালো ভালো বই পড়া, ছবি আঁকা, সিনেমা দেখা, বিভিন্ন জায়গায় ঘুরতে যাওয়া কিংবা বন্ধুদের সাথে খেলাধুলা করা যেতে পারে। আমাদের খুব সতর্ক থাকতে হবে যেন কোনো কিছুতে আসক্তি না জন্মে যায়, যেহেতু একবার সেটায় আসক্তি জন্মে গেলে সেখান থেকে বের হওয়া অনেক কঠিন। তাই সবচেয়ে ভালো হচ্ছে কোনো কিছুতেই আসক্ত না হওয়া।

Print Friendly and PDF

সর্বাধিক পঠিত