খবরাখবর

আফরিন আজহার ফিজা (১৭), ঢাকা

Published: 2020-05-20 08:50:34.0 BdST Updated: 2020-05-20 10:36:36.0 BdST

স্বেচ্ছাসেবী মায়ের সঙ্গে মিম যে বাসায় থাকে, সেটি এখন ছোটখাট ত্রাণ শিবিরের মত। করোনা-মহামারির মাঝে এই বাড়িতে প্রতিদিন শত শত মানুষের জন্য খাবার রান্না করা হয়।

সারাদিন মা এখানে থাকেন বলে, থাকতে হয় বাবার আদরবঞ্চিত মিমকেও-শুরুটা ছিল এভাবেই।

তবে শিগগির মিমও হয়ে  উঠে এখানকার একজন নির্ভরযোগ্য স্বেচ্ছাসেবী। ধীরে ধীরে নিজের কাজে সে ছাড়িয়ে গেছে সেখানে থাকা বড়দেরকেও।

এমনকি করোনাভাইরাসের  এই যুদ্ধে শিশু মনের তীব্র আকুতিতে ভরা সাইকেল কেনার স্বপ্নও আপাতত ত্যাগ করেছে মিম। বরং মাটির ব্যাংকে তিল তিল করে জমানো ৬০০টাকাও সে তুলে দিয়েছে ক্ষুধার্ত মানুষের আহারের জন্য।

বলছিলাম বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার লালমাটিয়া থেকে পরিচালিত মেহমানখানার সবচেয়ে কনিষ্ঠ সদস্য নয় বছর বয়সী মিমের কথা। এই মেহমানখানার ২৪ ঘণ্টার স্বেচ্ছাসেবক সে।

ছোট বলে শুরুতে শুধু গেট খোলার দায়িত্ব থাকলেও এখন সে হয়ে উঠেছে মেহমানখানার গুরুত্বপূর্ণ একজন।

এখানে নানা বয়সী ও পেশার মানুষ স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করে। সবার সঙ্গে হাতে হাতে কাজ করে মিমও।

কখনো সবজি কাটে, কখনো খাবার প্যাকেটে সাহায্য করে। ঘরের কোথায় কোন জিনিসটা রাখা আছে তার সবই এই শিশুর নখদর্পণে। তাই তো কেউ কিছু খুঁজে না পেলেই ডাকছে মিমকে। যেন মিমই এই মেহমানখানার কাজের অভ্যন্তরীণ সমন্বয়ক।  

মেহমান খানার আরেক স্বেচ্ছাসেবী শারিরীক প্রতিবন্ধী নারী রয়েছেন। পারিবারিক নির্যাতনের শিকার হয়ে যিনি আলো হারিয়েছেন দুই চোখে। হারিয়েছেন একটি হাতও। তবে মনের জোরটা যেন বেড়েছে অনেকগুন। তাই অন্য হাতটি তিনি লাগিয়েছেন স্বেচ্ছাসেবায়।

তবে নিজের ব্যক্তিগত কাজের জন্য তার দরকার একজন সার্বক্ষণিক সাহায্যকারী। এই প্রতিবন্ধী স্বেচ্ছাসেবী নারীর গোসল-খাওয়া থেকে শুরু করে যাবতীয় ব্যক্তিগত কাজে হাসিমুখে সহায়তা করছে ভবিষ্যতে ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন দেখা মিম।

খেলনা ফেলে আর্তের সেবায় ছোট্ট মিম

এছাড়া কিছু বেড়াল, কাক আর কবুতরের দায়িত্বও রয়েছে তার কাঁধে। আনন্দের সঙ্গে এই কাজও করছে মিম।

সমাজের যে অংশ থেকে মিম উঠে এসেছে, সেখানে মেয়েদের সাইকেল চালানো নিয়ে এখনো রয়েছে ট্যাবু। ছোট্ট বয়সে জীবনের কত কত নির্মমতার শিকার হওয়া মিম যেন অবচেতনে সেই ট্যাবু ভাঙার সিদ্ধান্তও নিয়েছিলেন। স্বপ্ন দেখতে শুরু করে একটি সাইকেলের।

কিন্তু মিমকে কে টাকা দেবে? শখ পূরণ বা অর্থনৈতিক দায়িত্ব নেয়াতো দূরের কথা, বাবা রাখেন না তাদের খবরও। সাইকেল কিনে দেয়ার সামর্থ নেই মিমের মায়েরও। অবশ্য মিম এই দায় কারো উপর চাপাতে চায়নি। তাই নিজেই মাটির ব্যাংকে জমানো শুরু করে টাকা।

শখের সাইকেলের জন্য মিমের ব্যাংকে জমা হয় ৬০০ টাকা একটু বেশি। একদিন মেহমানখানায় জরুরি কিছু সওদা লাগবে। অথচ কারো কাছেই সেই টাকার সংস্থান নেই। ছোট্ট মিম কী মনে করে ভেঙে ফেলে তার সেই প্লাস্টিকের ব্যাংক। ৬০০টাকা ‍তুলে দেয় স্বেচ্ছাসেবীদের হাতে। আরো কিছু খুচরো টাকাও ছিল। বেপরোয়া মিম দিতে চেয়েছিল সেগুলোও। কিন্তু বুঝিয়ে বলে সেগুলো তার কাছেই রেখে দেয়া হয়।

মিম হ্যালোকে বলে, “আমি আমার ব্যাংকে অনেক টাকা জমিয়েছিলাম। সেখান থেকে আমি আমার মামনিকে দিয়েছি মেহমানখানায় দেওয়ার জন্য।"

মিমের ভাষায়, বাজারটাতো সেদিন দরকার ছিল। সেটা না হলে হতো না। আমার টাকা নিয়ে চিন্তা কী? সেটা আবার হয়ে যাবে। হয়ত ঈদ সালামিতেই।

কিন্তু মিম কি জানে, ঠিক কত টাকা লাগবে তার সাইকেল ক্রয়ে?

চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী এই শিশু একমাত্র অবলম্বন তার মা জেসমিনের । মাও স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করে এই মেহমানখানায়। 

মিমের মা জেসমিন হ্যালোকে বলেন, “এখন স্কুল বন্ধ তাই আমাদের সবার সাথে কাজ করছে ও।”

মেহমানখানার স্বেচ্ছাসেবক সৈয়দ সাইফুল আলম শোভন হ্যালোকে বলেন, “মিম শুরু থেকেই আমাদের সাথে ছিল। আমরা যখন মিমকে ডাকি তখন ও বুঝে যায় সুনির্দিষ্ট কার কোন জিনিসটা লাগবে। আসলে আমরা গর্বিত মিমের সাথে কাজ করে।”

করোনাভাইরাসের এই সময়ে বই ফেলে, খেলনা ফেলে  এখন সামনের সারির যোদ্ধা হিসেবে কাজ করছে মিম।

 

Print Friendly and PDF

সর্বাধিক পঠিত