খবরাখবর

সাদিক ইভান (১৭), ঢাকা

Published: 2018-03-08 19:09:05.0 BdST Updated: 2018-03-08 19:47:26.0 BdST

নারী দিবস উপলক্ষে নিজেদের বিভিন্ন অভিজ্ঞতা, সাফল্য, সংগ্রাম ও অধিকার আদায়ে করণীয় সম্পর্কে হ্যালোর সঙ্গে কথা হয় বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার কজন নারীর।

লীনা পারভিন। একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মানবসম্পদ বিভাগে কাজ করছেন। আলাপাচারিতায় চাকরির ১৬ বছরের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি জানাচ্ছিলেন নারী কীভাবে ঘর সামলানোর পর আবার ছোটেন অফিস সামলাতে।

কর্মজীবী নারীর জীবন অনেক সংগ্রামের উল্লেখ করে তিনি বলেন, “রাতে ঘুমানোর আগে আমাকে ঠিক করতে হয় পরের দিন আমার সন্তানের টিফিনে কী দেবো?

“সকালে যখন অফিসের জন্য বের হই তখন গৃহপরিচারিকাকে আমার সারাদিনের রুটিন বলে দিয়ে আসতে হয়, দেখিয়েও দিতে হয়। অফিসে এসেও যখন অফিসের কাজে ‍ডুব দিচ্ছি তখনও কিন্তু আমার মাথায় ঘুরতে থাকে বাসাটা ঠিকমতো আছে কি না, সন্তানরা স্কুলে পৌঁছাল কি না, টিফিনটা খেল কি না ইত্যাদি।”

বলেন, “বাসায় ফেরার সময় আবার ভাবতে হচ্ছে বাসায় কোন জিনিসটা নাই, কোনটা নিতে হবে ইত্যাদি। এই যে একটা চক্র, নারীরা চাইলেও এ থেকে বের হতে পারছে না।”

তিনি যোগ করেন, “একজন নারী যখন নিজের চাওয়া পাওয়ার কথা ভাবেন তখন অনেক অপূর্ণতা দেখতে পান। আমার যদি ইচ্ছে হয় অফিস শেষে বন্ধুদের সাথে আজ আড্ডা দিতে যাব, একজন পুরুষ পারলেও আমি কিন্তু তা পারছি না।

“অফিসের ডিউটির পরপরই কিন্তু আমার বাসার ডিউটি শুরু হয়ে যাচ্ছে। অফিস থেকে বাসা, বাসা থেকে অফিস। নারীও তো মানুষ, সমাজের সব চাহিদা তার ভেতরে আছে।”

পারভীন আরো বলেন, “আমি যমজ সন্তান জন্ম দিয়েছি। আমার স্বামীর সহযোগিতা ছিল। আমি মনে করি নারীর মানসিক শক্তিটা খুব বেশি জরুরি। তার এই শক্তি যোগানে পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্রকে অবদান রাখতে হবে।”

বাসাবোর বাসিন্দা ফারহানা খান বৃষ্টি। একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে তিনি কর্মরত। পাশাপাশি ব্যবসাও করছেন। নিজের কাজগুলো সুন্দরভাবে সম্পাদনের জন্য তিনি স্কুটি ব্যবহার করেন।

বৃষ্টি বলছিলেন, “আমার দুলাভাইয়ের অনুপ্রেরণায় আমি স্কুটি চালাই। তিনিই আমাকে শিখিয়েছিলেন। প্রথম প্রথম বাসায় সবাই একটু ভ্রু কুঁচকেছিল। কিন্তু পরে যখন দেখল বাসায় ফিরতে আমার দেরি হচ্ছে না, সহজেই যাতায়াত করতে পারছি তখন তারা খুশি হলো।”

তিনি আরো বলছিলেন, “এলাকার মুরব্বিরা একটু কটু কথা বলতেন। কেউ কেউ বলতেন এ মেয়ের বিয়ে হবে না। কিন্তু আমি এখন বিবাহিত। বিয়ের চার বছর আগে থেকে আমি স্কুটি চালাই। আমার স্বামী স্কুটি চালানোর জন্যই আমাকে বিয়ে করেছেন। শ্বশুরবাড়ির লোকজনও ধীরে ধীরে মেনে নিয়েছেন।”

অন্য নারীদের পরামর্শ দিয়ে বৃষ্টি বলেন, “ট্রাফিক আইন মেনে সাবধানে যদি আপনারা স্কুটি চালাতে পারেন তাহলে যে লোকগুলো আপনার দিকে তাকিয়ে ভ্রু কুঁচকাবে সে নিজেই দেখবেন একসময় আপনার প্রশংসা করছেন।

“প্রথম প্রথম সবার চোখকে মানিয়ে নিতে একটু সময় লাগবে। কিন্তু সবাই প্রশংসা করবে। স্কুটি আপনাকে পাঁচ বছর এগিয়ে দিবে। এই স্কুটির জন্যই আজ আমি চাকরি, ব্যবসা দুটোই করতে পারছি। মানসিকভাবেই শক্তিশালী হয়েছি।”

ইন্দ্রাণী মল্লিকের অভিজ্ঞতাও অনেকটাই এরকম। বিয়ের পর তিনি একটা ট্রেনিং সেন্টারে সাইকেল চালানো শিখেছেন। স্বামীর সহযোগিতার কথা জানান তিনি। কিন্তু শ্বশুরবাড়ির লোকজনসহ অনেকেই এখনও বাঁকা চোখে দেখেন যা তিনি পরোয়া করেন না বলেও জানান হ্যালোকে। 

ইন্দ্রাণী বলেন, “মিরপুর থেকে পান্থপথে অফিসে যাই। বাসে ধাক্কাধাক্কির তুলনায় নিজের সাইকেলে করে চলে যাই এতে অনেক সুবিধা। বাসে পুরুষ যাত্রী ও হেল্পারের অশোভনীয় আচরণের মুখোমুখি হতে হয় না।”

নেওয়াজ ফারহিন অন্তরা একজন নারী সংবাদকর্মী। এ পেশার প্রতি ঝোঁক থেকেই তিনি সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে নিয়েছেন।

অন্তরা হ্যালোকে জানান, পরিবার তাকে সবসময় তার পাশে আছে। তাই কষ্টের এই পেশায় তিনি টিকে থাকতে পারছেন।

অফিস ও সহকর্মীদের কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, “দুটো মিডিয়া হাউজে কাজ করেছি, সবাই খুবই সাপোর্টিভ ছিলেন। সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গাটাতে নারী হিসেবে কখনো তারা আমাকে ছোট করে দেখেননি। গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে আমার মতামত দিতে পেরেছি, এখনও পারছি।”

একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছেন অধরা আফরিন। বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়া আসার ক্ষেত্রে গণপরিবহনই ভরসা।

গণপরিবহনের কর্মী ও পুরুষ সহযাত্রীদের সম্পর্কে তার প্রচুর নেতিবাচক অভিজ্ঞতা রয়েছে।

তিনি বলছিলেন, “গণ পরিবহনে নিগ্রহের শিকার হওয়া নিত্যদিনের ঘটনা। প্রতিবাদ করলে যুক্তি দেখায় ভিড়ের মধ্যে মেয়ে মানুষ কেনো উঠলাম? বাসের অনেক হেল্পারের আচরণও একদমই ভালো নয়।”

অধরা বলেন, “আমি চাই নারীরা প্রতিবাদ করতে শিখুক।”

রাজনৈতিক কর্মী নাসরিন হক বলেন, “রাজনীতিতে নারী পুরুষের কোনো পার্থক্য আমার চোখে পড়েনি। নেতৃত্বের জায়গায় দুজনই সমান। তাই রাজনীতিটাই আমার পছন্দ।

"পরিবার আমাকে সবসময় সহযোগিতা করেছে। ছাত্রজীবন থেকেই মিছিল করতাম। মিটিং এ যেতাম।"

"আর বাবার একটা কথা আমাকে এগিয়ে রেখেছে। সেটা হল, বাবা সব সময় বলতেন, 'তুমি ছেলে না মেয়ে তা ভাবার দরকার নেই, মানুষ হিসেবে এগিয়ে যাও'।"

Print Friendly and PDF

সর্বাধিক পঠিত