‘আমরা স্বাধীনতা এনেছি, তোমরা দেশকে এগিয়ে নাও’ (ভিডিওসহ)

“খুব কষ্টে দিনানিপাত করছি তারপরেও আমি আল্লাহর কাছে শুকরিয়া।”

১৯৭১ সালে পাক বাহিনীর আক্রমণের খবর রাজারবাগ পুলিশ লাইন থেকে সব পুলিশ স্টেশনে জানিয়ে দেন শাহজাহান মিয়া। হ্যালো ডট বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের সঙ্গে আলাপচারিতায় উঠে এসেছে তার মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের নানা স্মৃতির কথা।

হ্যালো: আমরা জানি আপনিই সর্বপ্রথম রাজারবাগ থেকে ওয়্যারলেসের মাধ্যমে ঢাকা শহরে আক্রমণের খবর সকল পুলিশ স্টেশনে জানিয়ে দেন, আপনার কাছে সেই সময়ের কিছু বর্ণনা শুনতে চাই।

শাহজাহান মিয়া: বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে আমরা উদ্বুদ্ধ ছিলাম যার ফলে আমরা ২৫শে মার্চ পাকিস্তানি সেনাবাহিনী যখন ট্যাঙ্ক, কামান, মেশিনগান নিয়ে অতর্কিত রাজারবাগ পুলিশ লাইন আক্রমণ করে, ইপিআর হেডকোয়ার্টার আক্রমণ করে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আক্রমণ করে, পুরানা ঢাকা শহর হিন্দু অধ্যুষিত এলাকা শাখারীপল্লীতে আক্রমণ করে। তখন কিন্তু প্রকৃতপক্ষে সে আক্রমণ প্রতিরোধ করার মতো কেউ এগিয়ে আসেনি।

তখনকার দিনে বেঙ্গল রেজিমেন্ট ছিল, ইপিআর ছিল কিন্তু কেউ আগে এগিয়ে আসেনি কিন্তু আমরা বাঙালি পুলিশ এই রাজারবাগের পুলিশ কিন্তু সেদিন বসে থাকেনি। আমরা যখন খবর পাই পুরা ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে শা শা রব হচ্ছে। আরো জানতে পাই আজকে রাতেই ঢাকা আক্রমণ করবে। তখনই কিন্তু আমরা প্রস্তুতি গ্রহণ করি। আমরা প্রায় ৯টার দিকে মোটামুটিভাবে একটা প্রস্তুতি ছিল। আমি এর পূর্বেই আগে আটটা সোয়া ৮টার দিকে একটি সংবাদ পাই ওরা ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে রাতে আক্রমণ করে যার ফলে আমাদের একটা প্রস্তুতি ছিল।

আমরা রাজারবাগ পুলিশ যে মুফিজ উদ্দিন সাব ছিলেন উনার কাছ থেকে অস্ত্রাগারের চাবি ছিনিয়ে নিয়ে অস্ত্র লুন্ঠন করি। আমি নিজে এবং আমার সহযোদ্ধা মনিরকে নিয়ে দুজনে দুইটা রাইফেল এবং ৩০ রাউন্ড গুলি নিয়ে আমরা ওয়্যারলেস স্টেশনে যাই এবং দায়িত্ব বহন করি।

তখন ১৯টি জেলা এবং ৩২টি মহকুমায় আমাদের পুলিশ ওয়্যারলেসের নেটওয়ার্ক ছিল। আমি দায়িত্ব নেয়ার পরে রাত ১০টা দশের দিকে প্রথম একটা বার্তা পাই ওয়্যারলেসে। সেটা তেজগাঁও এলাকায় প্যাট্রোলে থাকা ওয়্যারলেস থেকে মেসেজ দেন। সে বলছে , 'চার্লি সেভেন ফর বেইজ, হাউ ডু ইউ হেয়ার মি, ওভার। আমি উত্তরে বলি, 'বেইজ ফর চার্লি সেভেন, ইউ আর লাউড অ্যান্ড ক্লিয়ার, সেন্ড ইউর মেসেজ, ওভার।’

তখন সে বলে, 'চার্লি সেভেন ফর বেইজ, অ্যাবাউট থার্টি ফাইব টু থার্টি সেভেন ট্রাকস লোডেড উইথ পাকিস্তানি আর্মি আর প্রসিডিং টুওয়ার্ডস ঢাকা সিটি ফ্রম দ্য ক্যান্টনমেন্ট ওভার।

এই মেসেজ পাওয়ার পরে আমাদের বেইজ স্টেশনে আমরা দুজন রয়ে গেলাম বাকি সবাই চলে গেল। এই মুহুর্তে একজন গিয়ে পাগলা ঘণ্টা বাজায় এবং পাগলা ঘণ্টা বাজানোর পরে যে যেখানে ছিল তারা আবার ছুটে আসে তখন তারা অস্ত্র চাই, গুলি চাই বলে স্লোগান করতে থাকে। আরো স্লোগান করতে থাকে বীর বাঙ্গালি অস্ত্র ধরো বাংলাদেশ স্বাধীন করো। ওরা রিজার্ভ অস্ত্রাগারের তালা শাবল দিয়ে ভেঙে গুলি এবং অস্ত্র নিয়ে পজিশনে চলে যায়।

পজিশন বলতে ঢাকার রাজারবাগের ব্যারাকগুলো বিল্ডিং, প্রশাসনিক ভবনের চার তলা, ছাদ, পুকুর পাড়, পিআরে বেড়ায় পজিশন নেয় অন্যদিকে ক্যান্টনমেন্ট থেকে আসা দুইটা পথ একটা হলো পাক মটর যেটা বর্তমানে বাংলামোটর, ইস্কাটন হয়ে মগবাজার হয়ে, মালিবাগ হয়ে অন্যদিকে পাক মটর হয়ে যেটা বর্তমানে বাংলা মোটর ইস্কাটন হয়ে, মগবাজার হয়ে, মালিবাগ হয়ে রাজার বাগ আসার।

অন্যটি হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল হয়ে মিন্টু রোড, বেইলি রোড পার হয়ে শান্তিনগর হয়ে চামেলীবাগ দিয়ে যাওয়ার পর পথ ছিল। দুই পথেই আমাদের লোক ছিল, রাস্তার পাশে ছাদের উপরে অথবা দেয়ালের আড়ালে পজিশন নিয়েছিল। আমাদের একটা পক্ষ ছিল চামেলীবাগে যেখানে তখনকার দিনে একটা স্কুল ছিল দুতলা বিল্ডিং ডন হাই স্কুল যা বর্তমানে ইস্টার্ন প্লাস মার্কেট নামে পরিচিত। ওইখানে আমাদের লোক প্রায় ১০-১২ জন পুলিশ সদস্য পজিশনে ছিল এবং সামনে একটি বড় ধরনের ব্যারিকেড ছিল।

পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ট্যাঙ্ক, কামান, মেশিনগানের বহরটি যখন চামেলীবাগে ঢুকে শান্তিনগর পার হয় তখন দেখতে পাই বিরাট ধরনের একটা ব্যারিকেড। গাড়ি সেখানে থামতে হয় তারা যখন ব্যারিকেডে অপারেশন করার চেষ্টা করছি ঠিক সেই মুহূর্তে আমাদের ডন হাই স্কুলের ছাদে থাকা যুবক পুলিশ সদস্যরা অসীম সাহস নিয়ে তাদের দিকে লক্ষ্য করে গুলি ছুড়তে থাকে। এবং প্রথমে পাকিস্তানি সেনাদের দুজন পাক সেনা নিহত ও অনেকে আহত হয়। তখন কিন্তু ওদের ট্যাঙ্ক কামার মেশিনগান একসাথে গর্জে ওঠে আকাশ বাতাস কম্পমান। আগুনের ফুলকি উঠছে সারা ঢাকা শহর। 

সেই মুহূর্তে আমি কী করব? তখন কিন্তু বঙ্গবন্ধুর ভাষণে যে ওনি যে আহ্বান জানিয়েছে সেই কথাগুলো যেন বারবার আমার বিবেককে নাড়া দিচ্ছে কারণ তিনি বলে দিয়েছেন আমি যদি হুকুম দিতে নাও পারি তোমাদের কাছে যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করবে। তখন দেখা গেল আমার কাছে যে ওয়্যারলেস সেট আছে সেই ওয়্যারলেসের মাধ্যমে আমি সারা দেশকে জানিয়ে দিতে পারি। পাক সেনারা আমাদের আক্রমণ করছে আমরা প্রতিরোধ করছি তারাও যেন প্রতিরোধের চেষ্টা করে।

হ্যালো: দেশের কাছে আপনার প্রত্যাশা কী?

শাহজাহান মিয়া: আমার বয়স প্রায় ৮০ বছর। শারীরিক অবস্থা তেমন ভালো না, বর্তমানে শারীরিক, মানসিক সর্ব দিক দিয়ে অত্যন্ত দুর্বল হয়ে গেছি বাব। ছেলেরাও ছোটখাটো চাকরি করে কোনোভাবে জীবিকা নির্বাহ করে। কিন্তু আমার একটা বড় চাওয়া ছিল যে, আমার জীবদ্দশায় যদি বর্তমান সরকার মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার মাধ্যমে আমি স্বাধীনতা পুরস্কারটি পেয়ে যেতাম তাহলে আমার কোনো দুঃখ ছিল না।

সঠিকভাবে আল্লাহ আমাকে চালাচ্ছে আমি এক বেলা খেয়ে আছি। আল্লাহর কাছে শুকরিয়া, একাধারে আট দিন আট রাত আমি খাইনি দীর্ঘ নয় মাসের মধ্যে প্রায় তিন মাস আমি না খেয়ে যুদ্ধ করেছি আমার কোনো দুঃখ নেই। এই বাড়িটা ব্যতীত এক কাঠা নিজস্ব কোনো জমি নেই বা কোনো ব্যাংক ব্যালেন্স নেই।

আমি সোনালী ব্যাংক থেকে লোন নিয়ে এই বাড়িটা করেছিলাম। এখন পুকুরে মাছ চাষ করেছি। খুব কষ্টে দিনানিপাত করছি তারপরেও আমি আল্লাহর কাছে শুকরিয়া। আল্লাহ আমাকে ভালো রেখেছে। দোয়া করবেন আমি যেন ভাল থাকি। দেশের মানুষের কাছে এটাই চাওয়া।

তোমাদের কাছে আরেকটা চাওয়া আছে। আমি যা করেছি ১৯৭১ এ, ২৫ শে মার্চ পাকিস্তানি সেনাবাহিনীরা যখন পুলিশ লাইন আক্রমণ করে তখন আমরা বীরত্বের সাথে যে বাঙালি পুলিশরাও সেই প্রথম প্রতিরোধ করি এবং অতি সাহসে পাকিস্তানের আক্রমণের সংবাদ জানিয়েছিলাম সেই ইতিহাস বর্তমান প্রজন্মদের কাছে জাতীয় পাঠ্যপুস্তকে যেন সেই ঘটনাবলী এই বর্তমান সরকার একটু ঠাঁই দেয়। যাতে আগামী প্রজন্ম জানতে পারে যে, আমার কী বীরত্ব ছিল কী আমার সাহসিকতা ছিল, সেগুলো যেন আগামী প্রজন্ম জানতে পারে এটা কিন্তু আমার একটা প্রত্যাশা।

আর একটা প্রত্যাশা হলো, দেশের যারা ভবিষ্যৎ আগামী দিনের প্রজন্ম তাদের কাছে একটাই কথা আমি অনুরোধ করে বলতে চাই তোমরা দেশকে ভালোবেসো, তোমরা যে যেখানে থাকো না কেন, যে যাই কর্ম করো না কেন সততা এবং নিষ্ঠার সাথে থাকো। আমরা যুদ্ধ করে দেশ এনে দিয়েছি এক সাগর রক্তের বিনিময়ে। আমরা  সার্থক হবে দেশকে পর্যায়ক্রমে বিশ্বের দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবার মতো একটা দেশ করে করে যেতে পারলে। তখনই আমাদের স্বার্থকতা।

প্রতিবেদকের বয়স: ১২। জেলা: নেত্রকোণা।

এ সম্পর্কিত খবর

No stories found.

সর্বাধিক পঠিত

No stories found.