'বাল্যবিয়ে বন্ধে সরকার প্রতিজ্ঞাবদ্ধ' (ভিডিওসহ)

"এলাকাতে যখন আমরা বাল্যবিয়ে বন্ধ করতে যাই তখন এলাকাবাসীর অনেকেই ইতিবাচক এবং অনেকেই নেতিবাচকভাবে গ্রহণ করেন।"

বাল্যবিয়ে বন্ধে নানা উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয়। এ বিষয়ে জামালপুরের মাদারগঞ্জ উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মো. তৌফিকুল ইসলাম খালেকের সঙ্গে হ্যালো ডট বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের কথা হয়। বাল্যবিয়ে বন্ধে তাদের কর্মসূচি, চ্যালেঞ্জসহ নানা বিষয় উঠে আসে এই আলাপচারিতায়।

হ্যালো: বাল্যবিয়ে বন্ধে সচেতনতা তৈরির ক্ষেত্রে সমাজসেবা কার্যালয় নিয়মিত কোন ধরনের কাজ করছে?

মো. তৌফিকুল ইসলাম খালেক: বাল্যবিয়ে বর্তমানে বাংলাদেশের জন্য একটি উদ্বেগের বিষয়। বাল্যবিয়ে বন্ধে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। এরমধ্যে ১৯২৯ সালের যে বাল্যবিয়ে নিরোধ আইন ছিল সেটি সংশোধনের মাধ্যমে যুগোপযোগী করে বাল্যবিয়ে নিরোধ আইন ২০১৭ প্রণয়ন করেছেন। সেই আইন বাস্তবায়নে আমরা উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয় সর্বদা সক্রিয় আছি এবং বাল্যবিয়ে বন্ধে কাজ করে যাচ্ছি। বাল্যবিয়ে বন্ধের জন্য সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সমাজসেবা অধিদপ্তর ১০৯৮ নাম্বারের হেল্প লাইন চালু করেছে। সেই হেল্প লাইনের মাধ্যমে যদি বাল্যবিয়ে সংক্রান্ত কোনো তথ্য আমাদের উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয়ে আসে তাহলে সেই বিয়ে বন্ধে আমরা কাজ করি এবং অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়ে বা ছেলের পাশে দাঁড়াই।

উদাহরণস্বরূপ আমি বলব ২নং কড়ইচড়া ইউনিয়ন এবং ১নং চারপাকেরদহ ইউনিয়নের অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়ে ও ছেলের মধ্যে বিয়ের সন্ধান পাই এবং আমরা সেই বিয়ে বন্ধ করতে সক্ষম হয়েছি। এছাড়া আমরা বাল্যবিয়ে বন্ধে ও শিশু অধিকার সুরক্ষায় পাঁচটি ইউনিয়নে কমিউনিটি ডায়ালগ করেছি।

বাল্যবিয়ে বন্ধে আমাদের সমাজসেবা কার্যালয়ের পল্লীমাতৃ কেন্দ্র নামে একটি ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম রয়েছে। সেই ক্ষুদ্রঋণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আমরা মায়েদের নিয়ে ১০ জন বা ২০ জনের একটি করে কমিটি গঠন করি। এই কমিটির মাধ্যমে আমরা অ্যাওয়ারনেস বিল্ডআপ প্রোগ্রাম করি।

সেখানে বাল্যবিয়ে বন্ধ ও এর কুফল সম্পর্কে মায়েদের সচেতন করি এবং বাল্যবিয়ে বন্ধে আমরা কার্যকরী ভূমিকা পালন করি। এছাড়া আমাদের ইউনিয়ন সমাজকর্মী রয়েছে। সেই ইউনিয়ন সমাজকর্মীরা প্রতিনিয়ত আমাদের বিভিন্ন ইউনিয়নের দায়িত্বে থাকে। সেই ইউনিয়নগুলোতে তারা শিশু সুরক্ষা, বাল্যবিয়ে বন্ধ এবং নারী নির্যাতন প্রতিরোধ সংক্রান্ত বিষয়ে সর্বদা কাজ করে থাকে। তারা শিশুদের পাশে দাঁড়ায় এবং শিশু সুরক্ষায় কাজ করে।

যে সকল ফ্যামিলি অভাবে জর্জরিত এবং আর্থিক কারণে মেয়েদের অতি অল্প বয়সেই বিয়ে দিতে বাধ্য হয়, তাদেরকে আমরা ঋণ দিয়ে আর্থিকভাবে সাবলম্বী করি। এই কার্যক্রমের মাধ্যমে অনেক বাল্যবিয়ে বন্ধ করতে আমরা ইতিমধ্যে সক্ষম হয়েছি।

হ্যালো: ঠিক কী কী কারণে বাল্যবিয়ে বেশি হয় বলে আপনি মনে করেন?

মো. তৌফিকুল ইসলাম খালেক: বাংলাদেশে বাল্যবিয়ের অনেক কারণ রয়েছে। উল্লেখযোগ্য কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে, দারিদ্র্য। এটি একটি অন্যতম কারণ হতে পারে। কিন্তু আরও অনেক কারণ রয়েছে। অনেক অভিভাবক মনে করেন, ছেলে-মেয়েদের সামাজিক বিশেষ করে মেয়েদের সামাজিক নিরাপত্তার ঘাটতি রয়েছে। সামাজিক নিরাপত্তার এ উদ্বেগের কারণে অনেকে অল্প বয়সে মেয়েদের বিয়ে দিতে আগ্রহী হন। অনেক পরিবার মনে করেন, মেয়েদের বেশি বয়সে মেয়েদের বিয়ে দিলে মেয়েদের সৌন্দর্যহানি ঘটার সম্ভাবনা থাকে। এজন্য তারা অল্প বয়সেই মেয়েদের বিয়ে দিতে আগ্রহী হন। এছাড়া কোনো অভিভাবক যদি ভালো সম্বন্ধ পান সেক্ষেত্রে তাদের মেয়ের বয়স যদি দশ-বারো-পনের বছর যাই হোক না কেন সেটি তারা বিবেচনায় না নিয়ে বাল্যবিয়ে দিয়ে থাকেন। এছাড়াও আমি প্রথমেই উল্লেখ করেছি দারিদ্র্য বাল্যবিয়ের একটি কারণ।

হ্যালো: এই পর্যন্ত কতগুলো বাল্যবিয়ে বন্ধ করেছেন? বাল্যবিয়ে বন্ধ করতে গেলে এলাকাবাসীর প্রতিক্রিয়া কেমন হয়?

মো. তৌফিকুল ইসলাম খালেক: উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উদ্যোগে আমরা এই অর্থ বছরে প্রত্যক্ষভাবে তিনটি বাল্যবিয়ে বন্ধ করতে সক্ষম হয়েছি এবং পরোক্ষভাবে প্রায় ২০টির অধিক বাল্যবিয়ে বন্ধ করতে সক্ষম হয়েছি।

আর এলাকাতে যখন আমরা বাল্যবিয়ে বন্ধ করতে যাই তখন এলাকাবাসীর অনেকেই ইতিবাচক এবং অনেকেই নেতিবাচকভাবে গ্রহণ করেন। কেউ কেউ বলেন যে তাদের আর্থিক অবস্থা খারাপ, মেয়েদের ভরণপোষণ গ্রহণ করার মতো সামর্থ্য নেই। তাই তারা মনে করেন বাল্যবিয়ে দিলেই তারা মুক্তি লাভ করবেন এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে।

কেউ কেউ বলেন এই শিশুদের যদি সরকার থেকে বা বিভিন্ন এনজিও বা ধনবান ব্যক্তিরা যদি পেট্রোনাইজ করত তাহলে তারা পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারত এবং এই অতি অল্প বয়সে তাদের বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হতে হতো না।

হ্যালো: বাল্যবিয়ে বন্ধে উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয় থেকে কি কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে? যদি গ্রহণ করা হয় তাহলে সেই পদক্ষেপগুলো কী কী?

মো. তৌফিকুল ইসলাম খালেক: বাল্যবিয়ে বন্ধে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর যে স্বপ্ন; তিনি ২০১৪ সালে লন্ডনের গার্লস সামিটে একটি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে, ২০২১ সালের মধ্যে ১৫ বছর বয়সী যে বাল্যবিয়ে সংগঠিত হয় সেটি কমিয়ে আনবেন এবং ২০৪১ সালের মধ্যে শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনবেন এবং ১৫ থেকে ২১ বছর বয়সীদের মধ্যে বাল্যবিয়ে মুক্ত বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করবেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর যে দৃঢ় প্রতিশ্রুতি বা প্রত্যয় তা বাস্তবায়নে আমাদের উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয় নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। যেমন: আমরা প্রথমে বলেছি একটি পরিবার যখন আর্থিক অস্বচ্ছলতার কারণে বাল্যবিয়ে দেন তা বন্ধে আমরা আর্থিক সহযোগিতা দিয়ে থাকি। আমাদের রয়েছে ক্ষুদ্র ঋণ কার্যক্রম পল্লীমাতৃ কেন্দ্র এবং পল্লী সমাজসেবা কার্যক্রম। এই দুইটি ক্ষুদ্রঋণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আমরা ঋণ দিয়ে থাকি। একটি ফ্যামিলিকে সাবলম্বী করার জন্য তাদেরকে আমরা পাঁচ হাজার থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণ দেই।

এছাড়া আমরা সমাজসেবার বিভিন্ন প্রশিক্ষণের আয়োজন করে থাকি এবং সচেতনতামূলক বিভিন্ন প্রোগ্রামের আয়োজন করে থাকি। বিভিন্ন ইউনিয়নে আমাদের যে প্রকল্প গ্রাম রয়েছে সেই গ্রামে আমরা উঠান বৈঠকের মাধ্যমে বাল্যবিয়ে বন্ধে পদক্ষেপ গ্রহণ করে থাকি, অ্যাওয়ারনেস বিল্ডআপ করে থাকি এবং মায়েদেরকে বিভিন্ন উদ্ভাবনী কাজে ও বিভিন্ন ইনকাম জেনারেটিং অ্যাক্টিভিটিসে ইনভল্ব করি যাতে তারা উপার্জন করে ছেলেমেয়েদেরকে পড়াশোনা করাতে পারে এবং বাল্যবিয়ে বন্ধে তারা উদ্যোগ নিতে পারে।

প্রতিবেদকের বয়স: ১৬। জেলা: জামালপুর।

এ সম্পর্কিত খবর

No stories found.

সর্বাধিক পঠিত

No stories found.
bdnews24
bangla.bdnews24.com