সে অনুভূতি প্রকাশের ভাষা নেই

মুক্তিযোদ্ধা সুবেদার (অব.) আবদুস শহীদ রণাঙ্গণের নানা স্মৃতি তুলে ধরেন হ্যালোর কাছে। ১৯৬৩ সালের ৩০ জানুয়ারি তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। ’৭১-এ যুদ্ধ শুরু হলে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন।

গত ৭ই জানুয়ারি সন্ধ্যে সাতটায় হবিগঞ্জ চৌধুরী বাজারে তার বাসায় এ নিয়ে কথা হয় হ্যালোর সাংবাদিক ইফতেখার আহমেদ ফাগুনের।

৬৯ এর গণঅভ্যুত্থানের সময় আমি লাহোরে ছিলাম। ১৯৭০ এর জুনের ২৩ তখনকার পূর্ব পাকিস্তানে আসি আমি। এখানে এসে কুমিল্লাতে চতুর্থ বেঙ্গল রেজিমেন্টে যোগ দেই।

১৯৭০-এর নির্বাচনের সময় হবিগঞ্জের নিউফিল্ডে ক্যাম্প করি আমরা। নির্বাচনের পর কুমিল্লার উদ্দ্যেশে রওনা হই। গ্যারিসনে পৌঁছার পর জানতে পারি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে।

কিন্তু পাকিস্তানের শাসকরা ক্ষমতা দিতে নারাজ। আমরা তা বুঝতে পেরে আওয়ামী লীগ নেতাদের সাথে যোগাযোগ রাখি। কুমিল্লায় আমাদের জিনিসপত্র কেনা বন্ধ করে দেয়া হয়। আমাদের পাঠানো হয় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ওয়াপদা রেস্ট হাউজের কাছে।

এক পর্যায়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় কার্ফিউ জারি করি। আওয়ামী লীগ নেতাদের গোপনে কার্ফিউ ভাঙার পরামর্শ দেই। তাদের আশ্বস্ত করি যে আমরা কোন গুলি করব না।  

মার্চে কুমিল্লাতে সৈনিকদের উপর হামলার খবর পেয়ে আমরা তাদের সাথে যোগাযোগ করি। তাদের সাথে পাকিস্তানি অফিসার ও সৈন্য যারা ছিল তাদের গ্রেপ্তার করে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করি।

এখান থেকে ৪ কোম্পানীর ১ কোম্পানী ব্রাহ্মণবাড়িয়ার গোপঘাট, ১ কোম্পানী ব্রাহ্মণবাড়িয়া-কুমিল্লা বোর্ড, ১ কোম্পানী ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও ১ কোম্পানী শাহবাজপুরে পালিয়ে যাই।

যেসব অফিসারদের গ্রেপ্তার করেছিলাম তাদের সরাইল জেলখানায় বন্দি করে রাখি। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মূল শহরে আমাদের উপর হামলা করা হয়। তখন সেখান থেকে হবিগঞ্জের তেলিয়াপাড়া টি-গার্ডেনে চলে আসি। আসার সময় বন্দি অফিসারদের নিয়ে আসি। এখানে এসে দ্বিতীয় বেঙ্গলের সাথে যোগাযোগ করি। তারা তখন ময়মনসিংহ ছিল। দ্বিতীয় বেঙ্গল যখন তেলিয়াপাড়ায় চলে আসে তখন তাদের এখানে রেখে আমরা হবিগঞ্জের সাতছড়ি বাগানে চলে যাই।

ছেঁড়া পাঞ্জাবি-লুঙ্গি পরে হঠাৎ একদিন ওসমানী সাহেব, দাঁড়ি-গোঁফ ফেলে আমাদের সাথে এসে দেখা করেন। প্রথমে তাঁকে চিনতে পারিনি।

তখন ওসমানী সাহেব দ্বিতীয় ও চতুর্থ বেঙ্গলের অফিসারদের নিয়ে তেলিয়াপাড়ার ডাকবাংলোয় সভা করেন।

সভা শেষে ওসমানী সাহেব, খালেদ মোশাররফ, শফিউল্লাহ সাহেবসহ আরও কয়েকজন আগরতলা চলে যান। সেখানে আরেকটি সভা শেষে ফিরে আসেন।

এরপর অর্ডার আসে পাকিস্তানি অফিসার যারা বন্দী ছিল তাদেরকে ভারতীয় বিএসএফ এর লাছে সমপর্ণ করতে।

আমি তখন কমান্ডার জেসিইউ ৩৫ জন বন্দি অফিসারকে তেলিয়াপাড়া বর্ডার দিয়ে ভারতে দিয়ে আসি।

অফিসারদের হস্তান্তর করে আমি ক্যাম্পে ফিরে আসি।

এ সময় তখন ওসমানী সাহেবের নেতৃত্বে দ্বিতীয় ও চতুর্খ বেঙ্গলকে সেক্টরে ভাগ করা হয়। চতুর্খ বেঙ্গল ছিল ২নং সেক্টরের এবং কে-ফোর্সের অধীনে। কমান্ডার ছিলেন খালেদ মোশাররফ।

৩নং সেক্টর ছিল এস-ফোর্সের অধীনে। কমান্ডার ছিলেন শফিউল্লাহ। আমি চতুর্থ বেঙ্গলে থাকায় ২নং সেক্টরে পড়ি।    

অপারেশনের  স্মৃতি

আমরা ভারতে যাচ্ছি এমন সময় একটি অপারেশন করার নির্দেশ পাই। কুমিল্লা থেকে আখাউড়া রেললাইনের সেতুর কাছে পাকিস্তানিরা একত্র হয়। এখানে অপারেশনের জন্য আমরা আগরতলা হয়ে ওজানীসারে চলে যাই।

ঐ অপারেশনে শহীদ হন বীরশ্রেষ্ঠ মোস্তফা কামাল।

এরপর আমরা আবার আগরতলা আসি। এরপর আমার কোম্পানীর দায়িত্ব দেয়া হয় কুমিল্লার কসবায়। এখানে অনেকগুলো গেরিলা অপারেশন করি আমরা।

আমরা সোর্সের মাধ্যমে খবর পাই যে, কুমিল্লার পাক বাহিনীর ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এখানে একটি বাজারে স্পিড-বোটে করে আসছে। সেখানে পৌঁছার আগেই আমরা অ্যামবুশ করি।

সেই অপারেশনে সেই ব্রিগেডিয়ারসহ তাদের ২০জন অফিসার ও সৈনিক মারা যায়। আমাদের কেউ শহীদ হয়নি।

কসবায় কিছুদিন থাকার পর শালদা নদীর কাছে চলে যাই। এখানে কয়েকটি গেরিলা অপারেশন হয়। শালদা নদীর স্টেশনের পেছনে পাকিস্তানিদের ঘাঁটি ছিল। সেই ঘাঁটি উচ্ছেদের জন্য আমরা আক্রমণ করি। এতে নেতৃত্ব দেন খালেদ মোশাররফ।

শালদা নদীর সেই যুদ্ধে শহীদ হন আমাদের সহযোদ্ধা হাবিলদার বেলায়েত ও হাবিলদার মঈনুল। পাকিস্তানিদের ৩০ জন হতাহত হয়।

বেলায়েতের বাড়ি ছিল সন্দীপে ও মঈনুলের বাড়ি ছিল কুমিল্লায়। আমরা খবর পাই মগন্দবাজারের কাছে পাকিস্তানিদের সৈনিকরা আসছে। আমরা বাজারের কাছে অ্যামবুশ করি ও তাদের উপর আক্রমণ করি।

আমাদের কোন হতাহত ছাড়াই ২০ পাকিস্তানি নিহত হয়। তারা লাশগুলো ফেলে রেখে চলে যায়। আমরা লাশগুলো কে-ফোর্সের হেড কোয়ার্টার ভারতের মেলাঘরে বুঝিয়ে দিয়ে আসি। এর পরপরই ৪ জন পাকিস্তানি বাজারের উপর আক্রমণ করে। ঘন্টা দেড়েক পর তারা চলে যায়।

আমরা ফোর্স উইথড্র করে মগন্দবাজার স্টেশনের কাছে নিয়ে আসি। এখানে খবর আসল যে আমাদের ফেনীর বেলুনিয়ায় বদলী করা হয়েছে।

আমরা বেলুনিয়ায় গিয়ে অন্যান্য ফোর্সের সাথে যুদ্ধ করি। আমরা তখন ডিফেন্সে ছিলাম। ডিফেন্স উইথড্র করে ভারতে চলে আসি।

আমরা ভারতে চলে যাওয়ার পর সেখান থেকে আবার শালদা নদীতে যাই। এখানে মেজর জেনারেল অরোরার কাছ থেকে নির্দেশ পেয়ে পাক বাহিনীকে আত্মসমর্পণ করার জন্য অনুরোধ করে প্রচার করি। এরপর পাকদের কার্যক্রম এক রকম স্থগিত হয়ে যায়।   

তারপর এলো মহান বিজয় দিবস ১৬ই ডিসেম্বর। পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পন করবে। শালদা থেকে আমরা বেলুনিয়ায় যাই। বেলুনিয়া থেকে প্রথমে ফেনী,  সেথান থেকে হেঁটে চট্টগ্রামের দিকে রওনা হই।

এ সময় রাস্তায় পাকদের সাথে বেশ কয়েকটি সম্মুখ যুদ্ধ হয়। এটিই ছিল শেষ অপারেশন।  

এরপর আমরা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে উঠি। তখন খবর পাই যে ঢাকায় পাকরা আত্মসমর্পন করেছে। আমাদের প্রিয় বাংলাদেশ তখন স্বাধীন হয়ে যায়।

তখনকার অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করার মত নয়। এত আনন্দ লাগছিল যখন ঘোষণা শুনলাম- ‘আমি মেজর জেনারেল অরোরা বলছি। তোমরা আত্মসমর্পন কর। চারদিক থেকে তোমাদের সব সাহায্য বন্ধ হয়ে গেছে। বিমানেও তোমরা সাপোর্ট পাবে না ‘

আমরা তখন স্বাধীন পতাকা হাতে মা-বাবার কাছে ফিরে যেতে, বাংলাদেশে পা রাখতে উদগ্রীব হয়ে যাই। 

তোমরা স্বাধীন পতাকার নিচে জন্মেছো। সেই পতাকাকে ধরে রাখার চেষ্টা করবে, দেশের স্বাধীনতাকে ধরে রাখার চেষ্টা করবে। সবাই দেশের জন্য কাজ করবে।

এ সম্পর্কিত খবর

No stories found.

সর্বাধিক পঠিত

No stories found.