কথায় কথায়

পৃথা প্রণোদনা (১৪), ঢাকা

Published: 2017-02-23 18:23:05.0 BdST Updated: 2017-02-23 18:23:05.0 BdST

কদিন আগেই পালিত হলো ‍শিক্ষক দিবস। ভাবলাম আমার প্রিয় শিক্ষকের একটা সাক্ষাতকার নেব।

তিনি শুধু প্রিয় শিক্ষকই নন, আমার আদর্শও। জীবনের এই সময় পর্যন্ত অনেক কিছু শিখতে ও বুঝতে সাহায্য করেছেন তিনি।

তিনি আমাদের পদার্থ বিজ্ঞানের শিক্ষক। নাম মোস্তফা আমিনুর রশিদ মিরন। আমাদের কাছে তিনি ‘মিরন ভাইয়া।’ সাক্ষাতকারে মিরন ভাইয়া আমাকে অনেক সময় দিয়েছেন। এজন্য তাকে ধন্যবাদ।

হ্যালোঃ অন্য অনেক পেশা তো ছিল, শিক্ষকতা কেন পেশা হিসেবে নিলেন?

মোস্তফা আমিনুর রশিদ মিরনঃ আমি শিক্ষকতার সঙ্গে যুক্ত হই ৪৩ বছর বয়সে,  ২০১১ সালে। আমার বিগত দিনের অভিজ্ঞতা থেকে আমি এ সিদ্ধান্তে আসি যে, নানা কারণে মানবজাতির অস্তিত্ব আজ সঙ্কটাপন্ন।

মানুষের অজ্ঞতা, আর যা কিছু মানবিক সে সবের অবক্ষয়ের কারণেই এসব হচ্ছে । এ সঙ্কট থেকে উত্তরণের সম্ভাব্য সবচেয়ে কার্যকর পথ হচ্ছে এক নতুন মানবসমাজ গঠন যেখানে মানুষ হবে প্রকৃতিবান্ধব, বিজ্ঞানমনস্ক এবং যথার্থই মানবিক। শিশু শিক্ষা ছাড়া অন্য কোনো পথে এ লক্ষ্য অর্জন অসম্ভব মনে করেছি বলেই আমার শিক্ষকতাকে বেছে নেওয়া।

হ্যালোঃ শিশুদের সাথে কাজ করে কেমন আনন্দ পান?

মোস্তফা আমিনুর রশিদ মিরনঃ আমার মধ্যে যে শিশুটি ছিল, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাকে আমি হারিয়ে ফেলিনি। আমার কৌতূহল, বিস্মিত হবার ক্ষমতা তাকে এখনও বাঁচিয়ে রেখেছে। তাই শিশুরা শিশুদের সাথে কাজ করে যেমন আনন্দ পায়, আমিও শিশুদের সাথে কাজ করে তেমনি আনন্দ পাই।

হ্যালোঃ শিক্ষক জীবনের কোনো স্মরণীয় ঘটনা......

মোস্তফা আমিনুর রশিদ মিরনঃ ছয় বছরের শিক্ষকতার জীবন আমার জীবনের শ্রেষ্ঠতম সময়। অসংখ্য স্মরণীয় ঘটনায় সমৃদ্ধ হয়ে আছে এই বছরগুলো। তবে এসবের মধ্যে অনন্য ঘটনাও রয়েছে।

আমাদের বিদ্যালয়ে শিশুরা নিঃসংকোচে শিক্ষককে যে কোনো প্রশ্ন করতে পারে। তা হোক বিষয় সংশ্লিষ্ট বা প্রাসঙ্গিক-অপ্রাসঙ্গিক।

তাদের সব মতামতকেই সমান গুরুত্ব দেওয়ার চেষ্টা থাকে শিক্ষকের। শিক্ষকের মতামত কখনও তাদের উপর চাপিয়ে দেওয়া হয় না।

ফলে শিশু মনের বাধাহীন প্রকাশ ঘটে শ্রেণিকক্ষে। এরকমই একটি পরিবেশে আমি এক সময় বিস্মিত হয়ে উপলব্ধি করলাম শিশু আর প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে প্রধান পার্থক্য বয়সের নয়, দৃষ্টিভঙ্গির। একটি শিশুরও বিচারবোধ এবং সিদ্ধান্ত নেবার ক্ষমতা রয়েছে, তফাৎ শুধু এটুকুই যে সে এখনও আমাদের সামাজিকতায় অভ্যস্ত হয়ে স্বকীয়তা হারায়নি!

হ্যালোঃ বর্তমান শিশুরা ‘‘শিক্ষক’’ শব্দটি শুনলেই ভয় পায় ও আতঙ্কিত হয়ে ওঠে’-এ ব্যাপারে আপনার কী মতামত?

মোস্তফা আমিনুর রশিদ মিরনঃ সাধারণভাবে এটা সব শিশু বা শিক্ষকের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয় বলেই মনে করি। শিক্ষকের শ্রেণির পাঠ বা তার দেওয়া কাজ আকর্ষণীয় না হলে শিশুরা তা পছন্দ করবে না। তখন শিক্ষক যদি নিজের সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করার চেষ্টা না করে শিশুকে তার কাজ করতে বাধ্য করেন এবং শিশুর পরিবারের সদস্যরা ব্যাপারটা বুঝতে চেষ্টা না করেই শিক্ষককে সমর্থন করে চাপ প্রয়োগ করে, তখন এরকম পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।

হ্যালোঃ ‘আধুনিক শিক্ষা ব্যাবস্থা’ সম্পর্কে  আপনার কিছু বলার আছে কী?

মোস্তফা আমিনুর রশিদ মিরনঃ তোমার প্রশ্নে যদি ‘বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থা’কে আধুনিক বলে বোঝানো হয়ে থাকে তবে এক কথায় বলা যায়, বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থায় শিক্ষার্থী ও শিক্ষকের স্থানটি পরীক্ষার্থী ও পরীক্ষক দখল করে নিয়েছে। ফলে এটাকে শিক্ষা ব্যবস্থা না বলে ‘পরীক্ষা ব্যবস্থা’ বললে এর প্রকৃত স্বরূপটি বুঝতে সুবিধা হয়। এরকম একটি ব্যবস্থা নিশ্চয়ই আমাদের কাম্য নয়। আর এরকমটা না হলেই বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থা ‘আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থা’ হতে পারত।

হ্যালোঃ বর্তমান শিশুরা দিনের অর্ধেক সময় ব্যয় করে প্রাইভেট টিউটর, কোচিং এ পড়ে। এ  ব্যাপারে আপনার কোন মতামত?

মোস্তফা আমিনুর রশিদ মিরনঃ দিনের অর্ধেক সময় যদি এভাবেই ব্যয় হয় তাহলে বিদ্যালয় কী করছে? শিশু বিদ্যালয়ে আসে সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়ার একটি প্রধান অংশ হিসেবে। পড়াশোনা করাটাই শিশুর একমাত্র কাজ নয়, যদিও বিদ্যালয়ে এটি শিশুর অন্যতম কাজ। পড়াশোনার বাইরে আর যে সব সামাজিকীকরণের প্রক্রিয়াগুলো রয়েছে সেগুলোর জন্যও তো সময় প্রয়োজন। খেলাধুলা, বেড়ানো, অবসর কাটানো, নানা ধরণের বইপত্র পড়া, চারু-কারু আর সঙ্গীত চর্চা করা, প্রতিবেশীদের সঙ্গে মেলামেশা করা, আত্মীয়-স্বজনদের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা করা – এমনি আরো অসংখ্য জরুরী বিষয় সামাজিকীকরণের প্রক্রিয়াটিকে ফলপ্রসু করে তোলে। সে কাজগুলো ঠিকমতো না হলে শিশুর স্বার্থপর, অসৃজনশীল এবং দায়িত্বজ্ঞানহীন নাগরিক হয়ে ওঠার সম্ভাবনা বেশি। সেটা নিশ্চয়ই কেউ চাইবে না।

হ্যালোঃ একজন শিশুর স্বাভাবিক বিকাশের জন্য মা-বাবা এবং একজন শিক্ষকের কী কী করণীয় বলে আপনি মনে করেন?

মোস্তফা আমিনুর রশিদ মিরনঃ এই প্রশ্নের উত্তরের অনেকখানি আগের প্রশ্নোত্তরগুলোতেই রয়েছে। এর বাইরে সংক্ষেপে শুধু একটি আত্মজিজ্ঞাসা যোগ করার আছে। আমরা কি সত্যিই শিশুর স্বাভাবিক বিকাশ চাইছি, না আমরা শিশুকে যেনতেন ভাবে একজন পেশাজীবিতে পরিণত করতে বদ্ধপরিকর?

হ্যালোঃ আপনাকে ধন্যবাদ।

মোস্তফা আমিনুর রশিদ মিরনঃ তোমাকেও ধন্যবাদ।

Print Friendly and PDF

সর্বাধিক পঠিত