শূন্যে ভেসে বেড়ানোর আনন্দ

‘সবাই বাঁচাতে আসা পর্যন্ত আমি ভেসে থাকতে পারব। এরকম নানা কিছু ভেবে নিজেকে সান্ত্বনা দিচ্ছিলাম।'
শূন্যে ভেসে বেড়ানোর আনন্দ

অনেক ছোট থেকেই প্যারাসেইলিং আর প্যারাগ্লাইডিং এর ভিডিও দেখে আমার একবার হলেও আকাশে ভেসে থাকার খুব শখ তৈরি হয়। কিন্তু যতটাই আনন্দের ততটাই ঝুঁকির হওয়ায় সম্ভব হয়নি।

নিজেরও সাহস যেমন হয়নি, তেমনি মা-বাবাও রাজি হয়নি। কিন্তু এবার এসএসসি পরীক্ষা শেষে কক্সবাজার গিয়ে মনে মনে তৈরি ছিলাম, এবার যেভাবেই হোক প্যারাসেইলিং করেই ছাড়ব।

এ বছরের ২৬ অক্টোবর আমরা পৌঁছাই কক্সবাজার। ৩টার দিকে পৌঁছানোর পর হাতে তেমন সময় ছিল না, সাগরপাড়ে একটু হাঁটাহাঁটি করেই দিন শেষ। পরদিন দুপুরে বেড়িয়ে পড়ি প্যারাসেইলিং করতে।

যাদের মাধ্যমে প্যারাসেইলিং করব, আগে থেকেই তাদের সঙ্গে কথা হয়েছে। তারা জানিয়েছিল বিকাল ৩টার আগে করতে পারলে আবহাওয়া ভালো থাকবে ও ঝুঁকিও কম থাকবে।

প্রায় আড়াইটার দিকে আমরা পৌঁছে যাই প্যারাসেইলিং করার স্থানে। ভাটা চলায় সমুদ্রের পানি বেশ দূরে ছিল। অনেকখানি হেঁটে পৌঁছাতে হয়েছে মূল জায়গায়।

আকাশে ভেসে বেড়ানোর আগে আমাকে লাইফ জ্যাকেট, প্যারাস্যুটের সঙ্গে যুক্ত থাকা বেল্ট পরিয়ে দেওয়া হলো। তারা আমাকে বুঝিয়ে দিলে বিস্তারিত সব। একটু পরই পা মাটি থেকে উঠে গেল আর আমি ভাসতে শুরু করলাম আকাশে বাতাসে।

শূন্যে ভাসার অনুভূতি এই প্রথম ছিল না। বিমান, নাগরদোলা আর ক্যাবল কারে যতবার উঠেছি তখন এই অনুভূতিটা পেয়েছি। ওঠা ও নামার সময় বুক আর পেটের ভেতর কেমন জানি একটা ধাক্কা লাগে!

আমি ভেবেছিলাম প্যারাসেইলিং করার সময়ও এমন অনুভূতি হবে। কিন্তু আসলে কোনো কিছুই মনে হয়নি। কোনো অতিরিক্ত অনুভূতিই অনুভব করিনি। মনে হচ্ছিল এমন উড়ে বেড়াই সব সময়।

শূন্যে উঠে যাওয়ার পর ধীরে ধীরে অনেক উপরে আর সাগর পাড় থেকে দূরে উড়িয়ে নেয় আমাকে। মনে হচ্ছিল সূর্য যেন আমার মাত্র এক হাত উপরে। দূরে এক পাশে মনে হচ্ছিল, সমুদ্র আর আকাশ একত্রে মিশে ধোঁয়া ধোঁয়া হয়ে গেছে!

আরেক পাশে সমুদ্রপাড় আর পাহাড়গুলো খুবই ছোট দেখাচ্ছিল। সমুদ্রের ঢেউয়ের মৃদু গর্জন আর আমার বুকের ধক ধক শব্দ কানে শুনতে পাচ্ছিলাম। নিজেকে বোঝাচ্ছিলাম লাইফ জ্যাকেট পরা আছে আমার আর আমি কিছুটা সাঁতার কাটতে পারি তাই পড়ে গেলেও কোনো অসুবিধা নাই। সবাই বাঁচাতে আসা পর্যন্ত আমি ভেসে থাকতে পারব। এরকম নানা কিছু ভেবে নিজেকে সান্ত্বনা দিচ্ছিলাম।

এরকম মিশ্র অনুভূতি নিয়ে প্রায় সাত/আট মিনিট ভেসে থাকার পর টের পেলাম ধীরে ধীরে পাড়ের দিকে যাচ্ছি। বিন্দুর মত ছোট ছোট মানুষগুলো সব স্পষ্ট হতে শুরু করল। তখন মাইকের শব্দও শুনতে পেলাম।

কী বলছে স্পষ্ট বুঝতে না পারলেও কী বলবে তা আগেই জানা ছিল। তাই নির্দেশনা অনুযায়ী গায়ের সমস্ত জোর দিয়ে রশি টান দিলাম। হাতে প্রচুর ব্যথা করলেও ছাড়িনি, ধরে রাখছিলাম।

আস্তে আস্তে নিচে নেমে যাচ্ছি টের পেলাম। রশির টানও বাড়ছিল তাও শক্ত করে ধরে রেখেছি। এরপর উনারা বললেন ছেড়ে দিতে, তারপর ছেড়ে দিতেই মুহুর্তের মধ্যে খুব স্বাভাবিকভাবে নিচে নেমে গেলাম।

নেমে আসার পর কিছুক্ষণ আমি পুরাই হচকিত ছিলাম। যদিও খুব দ্রুতই স্বাভাবিক হয়ে যাই। আমার জীবনে স্মরণীয় অভিজ্ঞতা হিসেবে এই প্যারাসেইলিংয়ের অভিজ্ঞতা থাকবে। সামনে হয়ত আরো সুন্দর জায়গায় ঘুরব, আবারো হয়ত প্যারাসেইলিং করব, কিন্তু প্রথমবার হাওয়ায় ভাসার এই অভিজ্ঞতা কখনোই ভুলে যাওয়ার মতো নয়।

প্রতিবেদকের বয়স: ১৫। জেলা: খুলনা।

এ সম্পর্কিত খবর

No stories found.

সর্বাধিক পঠিত

No stories found.
bdnews24
bangla.bdnews24.com