জীবনের সোনালী অধ্যায়ের নাম হ্যালো | hello.bdnews24.com
আমার কথা

শেখ নাসির উদ্দিন (১৭), পঞ্চগড়

Published: 2021-07-25 21:39:41.0 BdST Updated: 2021-07-25 22:42:38.0 BdST

কখনো আমার আমিকে চিনতে পারিনি। নিজের ভেতর সৃজনশীলতা লুকিয়ে ছিল সেটা প্রকাশের সুযোগ পাইনি। স্বাধীন দেশে থেকেও শুধু টাকার অভাবে পরাধীনতার শিকল পরে ছিলাম।

মাথা উঁচু করে নিজের অধিকারটুকু আদায় করতে না পেরে মানুষের নির্যাতন ও বাঁকা কথাও কম শুনিনি।

তাই একটা সময় খুব ইচ্ছে জাগে আমাকে বড় কিছু হতে হবে। কিন্তু কোথায় থেকে শুরু করব জানি না। পত্রিকা পড়ার ঝোঁক ছিল বলে একদিন লেখালেখি শুরু করলাম। ফেইসবুকে ছোট ছোট নিউজ লিখতে লিখতে হ্যালোতে যোগ দান করেছিলাম ২০১৭ সালের জানুয়ারি মাসে। মোবাইল ডেটা কিনে প্রতিবেদন পাঠানোর টাকা ছিল না। ফেইসবুকের মেসেঞ্জারে লেখা পাঠাতাম।

এখনো মনে আছে প্রথম যে লেখা পাঠাই সেটা পাঁচ হাজারের বেশি শব্দে লেখা ছিল। অফিস থেকে ফোন দিয়ে কম শব্দে গুরুত্বপূর্ণ কথা লিখতে বলা হলো। খবর কীভাবে লিখতে হয় তা বুঝিয়ে বলা হলো। পরের বার আমি ছোট করে লিখে পাঠিয়েছিলাম। সেটা প্রকাশিত হতে সময় লেগেছিল এক মাসেরও বেশি।

আমি তো হাল ছেড়েই দিয়েছিলাম। একদিন হঠাৎ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমে ঢুকে দেখি আমার ছবিসহ ‘আমার জীবনের চড়াই-উৎরাই’ শিরোনামে লেখা প্রকাশিত হয়েছে। এত আনন্দ হয়েছিল যে সে রাতে চোখে আর ঘুম আসেনি।

এরপর একের পর এক লেখা প্রকাশিত হয়েছে। সহজে লেখা পাঠানোর মতো কোনো মোবাইল ফোন ছিল না আমার। তবুও লেগে ছিলাম হ্যালোর সঙ্গে। হ্যালোতে আট মাস কাজ করার পর আমাকে নেপালে ইউনিসেফের একটি মিটিংয়ে পাঠানো হয়। সেই চারটা দিনের প্রতিটি সেকেন্ড আমার জীবনে স্বর্ণ দিয়ে লিখে রাখার মতো। সত্যিই কখনো ভাবিনি বিমানে চড়ে দেশের প্রতিনিধিত্ব করার জন্য অন্য একটা দেশে যাব।

এরপরের প্রেক্ষাপট ভিন্ন হবার কথা থাকলেও দিনমজুরের ছেলে দিনমজুরই হবে এমন ভাবা লোকগুলো অসহযোগিতা ও বিরোধিতা করত। যাতে আমার পথচলা আটকে যায়। তবুও থেমে থাকিনি এগিয়ে গেছি শক্তি নিয়ে।

নেপালে প্রোগ্রামের সময় হাত খরচের জন্য মোটা অঙ্কের টাকা পাই। তা দিয়ে ভালো ফোন কিনে ভিডিও প্রতিবেদন করতে শুরু করি। তারপর উপবৃত্তি ও টিফিনের টাকা দিয়ে মাইক্রোফোন ও ট্রাইপড কিনেছিলাম। ভিডিও প্রতিবেদনও করেছি অর্ধশতর বেশি।

হ্যালো আমার কাজের মূল্যায়ন করে তার স্বীকৃতি যেমন দিয়েছে, সেই সাথে হ্যালো থেকে অনেক উপহার পেয়েছি। বার্ষিক বনভোজনে গিয়েছি। বড়দের ভালবাসা পেয়েছি আর পেয়েছি আজীবন মনে রাখার মতো বড় ভাই, আপু ও বন্ধু।

এই তো গত বছর আমাকে সেরা সাংবাদিকের একজন করেছে হ্যালো। ভেবেছিলাম পুরষ্কার প্রাপ্তির সেই টাকায় ল্যাপটপ কিনব। সব সময় চেয়েছি বাবা মার পাশে দাঁড়াতে। তাই ল্যাপটপ কেনার ইচ্ছা চাপা দিয়েছি। সেটা টাকায় বাবাকে জমি বর্গা নিয়ে দিলাম।

এসএসসির পর পরিবার ঠিক করেছিল লেখাপড়া করাবে না। আমিও ভেবেছিলাম আমাকে দিয়ে কিছুই হবে না। মাস কয়েক একটা দোকানে কাজও করেছি তখন অনেক বড় আপু, ভাইয়ারা সাহস জোগান। কলেজে ভর্তি হই, এইচএসসি পাশ করেছি। অপেক্ষা করছি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার। জানি না কতদূর কী করতে পারব, কিন্তু আমি পড়তে চাই।

এতদিনে সাংবাদিকতা যেন রক্তে মিশে গেছে। মূল্যবোধ ও আত্নসম্মানবোধ দেশের জন্য কাজ করার তাগিদ দিয়েছে বারবার। যতটা পেরেছি অসহায় মানুষের কথা লিখেছি। জনদুর্ভোগের কথা লিখে সমাধানের চেষ্টা করেছি। সত্যি বলতে সাংবাদিকতা ছাড়া অন্য কোন কাজে এত মনযোগ আসে না।

ভালোবাসা আর নিজের সর্বোচ্চ মেধা দিয়ে কাজ করি। সাংবাদিক হয়ে বাকি জীবন বেঁচে থাকতে চাই। এটিই হয়ত হ্যালোতে আমার শেষ লেখা। সবাইকে খুব মনে পড়বে।

শুভকামনা হ্যালোর জন্য, এভাবেই হ্যালোর হাত ধরে শিশুর সৃজনশীলতা প্রকাশ হোক যুগের পর যুগ।

Print Friendly and PDF

সর্বাধিক পঠিত