আমার কথা

তাসনুভা মেহ্জাবীন (১২), খুলনা

Published: 2020-01-08 17:31:54.0 BdST Updated: 2020-01-08 17:33:08.0 BdST

প্রতি বছরই চিকিৎসা, ভ্রমণ, কেনাকাটা ও নানা কারণে অসংখ্য মানুষ বাংলাদেশ থেকে ভারতে যায়। তাদের বড় অংশের কারণ থাকে চিকিৎসা। চিকিৎসার জন্য ভারতের স্বনামধন্য হাসপাতাল খ্রিস্টান মেডিকেল কলেজ বা সিএমসি।

আমি ও আমার পরিবার চিকিৎসার জন্য নির্ভরযোগ্য হিসেবে এই প্রতিষ্ঠানে প্রায়ই যাই। এবার ডিসেম্বর মাসে আবারো গিয়েছিলাম ভেলোর, সিএমসিতে চিকিৎসার উদ্দেশ্যে। অন্যান্য বারের চেয়ে এবারের সময়টা ভিন্ন ছিল কারণ দীর্ঘ ১৮ দিন সেখানে অবস্থান করেছি যা আগে কখনো কোথাও করা হয় নি।

ডিসেম্বরের ১২ তারিখ খুলনায় বাসা থেকে রওনা দেই বেনাপোল বর্ডারের উদ্দেশ্যে। যাব আমি, আমার ছোট বোন, মা ও আমার নানু। আমার শারীরিক কিছু সমস্যা, আমার নানুর চিকিৎসা ও মায়ের চেকআপ মূল উদ্দেশ্য। বেনাপোল বর্ডার পার হয়ে কলকাতা গিয়ে রাতে থাকলাম। ১৩ তারিখ দুপুর ৩ টায় চেন্নাইয়ের জন্য ফ্লাইট।

কলকাতায় চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতা ও আবহাওয়ার কারণে ফ্লাইট ৫ ঘণ্টার মতো ডিলে হয়। অবশেষে ৭:৫০ এ প্লেন ছাড়ে। রাত ১০ টার দিকে চেন্নাইয়ে পৌঁছাই। রাতে চেন্নাই থেকে পরদিন ১১টার দিকে ভেলোরের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। ৪ টার দিকে পৌঁছাই ভেলোরে।

পরেরদিন হাসপাতালের রেজিস্ট্রেশনও অন্যান্য কাজে ব্যয় হয়। মাঝে একদিন কাজ ছিল না। তারপর থেকে শুরু হয় হাসপাতালে দৌঁড়াদৌঁড়ি।

সিএমসির চিকিৎসা ব্যবস্থা সময়সাপেক্ষ। তাই প্রতিদিনই নানান কাজ থাকত। কোনোদিন আমার টেস্ট, কোনোদিন নানুর ডাক্তার, মায়ের কাজ আবার কোনোদিন তিনজনের একসাথে।

দূরদেশেও একা চলাফেরা করতে হয়েছে। হয়তো আমার কাজ সকালে নেই, দুপুরে। একাই হোটেল থেকে হাসপাতাল পর্যন্ত যেতাম। টিভি, মুভি দেখে শেখা হিন্দিটা দারুণ ব্যবহারে লেগেছে। নানান হাসপাতালের ফর্মালিটি কত কিছু সামলেছি।

তার সাথে ছিল সেখানের কড়া রোদ ও গরম। দেশে যখন শৈত্যপ্রবাহ তখন সেখানে ৩০-৩২ ডিগ্রিতেও তাপমাত্রা উঠে যেত, রোদের তীব্রতায় চলাফেরা করা যেত না।

এছাড়াও অসুবিধা বিষয় খাওয়া-দাওয়া। সেখানের রান্না খাবার খাওয়া যায় না। দুয়েকটা বাঙালি হোটেল থাকলেও খাওয়ার খরচ অনেক বেশি। কয়েকদিন নিজেরা রান্না করতে গিয়ে দুর্ঘটনা ঘটল। তারপরও বেশ কয়েকদিন নিজেরাই রেঁধে খেয়েছি। বাকি দিন কেটেছে বিরিয়ানি, তান্দুরি, ফাস্টফুড খেয়ে।

এর মাঝে ঘুরে আসি টিপু সুলতানের ফোর্ট ও স্বর্ণমন্দির। টিপু সুলতানের ফোর্ট পুরোটা ঘুরে দেখা সম্ভব না হলেও কিছুটা দেখেছি। স্বর্ণ মন্দিরেও সনাতন ধর্মালম্বী ব্যতীত কারো প্রবেশাধিকার না থাকায় ঢোকা হয়নি। তবে ভেলোরের পাহাড়ে ছেয়ে থাকা ও অতি উন্নত মানের রোডে গাড়ির যাত্রা আনন্দময়ই ছিল। টুকটাক শপিংও করেছি আর কি!

তারপরও সবকিছু শেষে সবার চিকিৎসা শেষ হয়। ২৮ তারিখ সবার রিপোর্ট ক্লিয়ার হলে ২৯ তারিখের ফ্লাইটে কলকাতা ও ৩০ তারিখ দেশে ফিরে আসি। কলকাতা থেকে বর্ডার ও বর্ডার থেকে বাসা উভয় পথেই প্রচণ্ড জ্যাম ১৮ দিনের ক্লান্তির চেয়েও বড় ক্লান্তি এনে দেয়। সব মিলিয়ে এখন এই নিজের দেশের বাতাসে শ্বাস নিতে পারছি।

ভারতে কাটানো ১৮ দিনে দেশকে ও বাবাকে মিস করেছি। তারপরও সেখানের অস্থায়ী নিবাস অর্থাৎ হোটেলের সবকিছুকেও এখন মিস করছি। হোটেলের লবিটা, সেখানের স্টাফরা, প্রতিবেশীরা সকলকে। হোটেলের কর্মচারী এবং মালিক সকলের আন্তরিকতা ও সহযোগিতায় হোটেলটা নিজেদের বাসার মতোই হয়ে উঠেছিল। এছাড়া যে ট্যুর এজেন্সির মাধ্যমে গিয়েছি তাদের সার্বক্ষণিক তত্ত্বাবধান ও আন্তরিকতাও সময়টাকে আনন্দময় করে তুলেছিল।

বাসা ছাড়া কোথাও এতদিন আমি থাকিনি, তাই এবারে ভারতে কাটানো সময়টা আমার জীবনে সমসময় চিরস্মরণীয় থাকবে।

Print Friendly and PDF

সর্বাধিক পঠিত