আমার কথা

নিয়ামুর রশিদ শিহাব (১৭), বরিশাল

Published: 2019-09-03 14:47:36.0 BdST Updated: 2019-09-03 14:47:36.0 BdST

ছোটবেলা থেকেই স্বপ্ন দেখতাম বড় একটা শহরের ভালো কলেজে ভর্তি হব। সুশিক্ষিত মানুষ হয়ে দেশ ও দশের সেবায় কাজ করব। আমার মতো এমন স্বপ্ন প্রত্যেক শিক্ষার্থীরই থাকে। সেই স্বপ্ন নিয়ে আস্তে আস্তে সামনের পথে এগিয়ে চলছি।

২০১৯ সালে মাধ্যমিক স্তর শেষ করে দক্ষিণ বাংলার ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বরিশাল সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে কম্পিউটার ডিপার্টমেন্টে পড়ার সুযোগ পেলাম। সুযোগ পাওয়ার পর থেকেই মনে মনে ভেবেছি প্রতিষ্ঠানটিতে আমারও খানিকটা অধিকার আছে।

তবে এই ভালো লাগাকে পাশ কাটিয়ে ভয়ও ছিল। নিজ এলাকা ও পরিবার ছেড়ে বহু দূরে একা একা থাকতে হবে। কেমন হবে সে দিনগুলো? নতুন পরিবেশ, কোথায় থাকবো, ক্লাস কেমন হবে, সবার সাথে চলব কীভাবে এরকম হাজারো প্রশ্ন যেন মাথায় জট পাকাচ্ছিল। এভাবেই চলে আসলো আমাদের প্রথম ক্লাসের দিন।

পহেলা অগাস্ট ছিল আমাদের ওরিয়েন্টেশন ক্লাস। তাই সকাল সকালই ক্যাম্পাসে চলে আসি। চার দিকে সব অপরিচিত মুখ। কম্পিউটার ডিপার্টমেন্টের ভবনে গিয়ে দেখি অনেক ছেলে মেয়ে জটলা বেঁধে আছে। সবাই অপেক্ষা করছে। চার-পাঁচ জন বাদে প্রায় সবগুলো মুখই অচেনা। তারপর ধীরে ধীরে একে অপরের সঙ্গে কথা বলা শুরু করলাম। তুই, তুমি, আপনিতে চলে আলাপচারিতা। কী নাম, কোথায় থেকে এসেছি? আর এভাবেই বন্ধুত্ব শুরু।

কিছুক্ষণ পরই আমাদের ওরিয়েন্টেশন রুমে যেতে বলা হয়। রুমে ঢুকেই মনটা আনন্দে ভরে গেল। কী সুন্দর করে সাজানো রুমটা। রঙ বেরঙের বেলুন, ফুল, কার্ড দিয়ে আপু ভাইয়ারা আন্তরিক ভালোবাসা দিয়ে বরণ করে নিলেন তাদের ছোট ভাই বোনদের। আবার দেয়ালে কিছু নীতি বাক্যও লেখা ছিল। সেসব দেখে নিজে নিজে অনুপ্রাণিত হই। বড়দের আন্তরিকতায় ভয়ের অনুভূতিটা আমাদের মাঝে যেটুকু ছিল সেটাও একটু পরই কেটে গেল। আপু ভাইয়ারা আমাদের সবার সাথে পরিচিত হলেন, শেখালেন কীভাবে ক্যাম্পাসে পরিচয় দিতে হয়। আমরাও নিজেদের পরিচয় তাদের দিচ্ছিলাম। সবার সঙ্গে পরিচয়ের পর খুব অবাক লাগছিল জেনে যে, কত জেলা ও শহরের বিচিত্র মানুষ আমরা একত্রিত হয়েছি, ভবিষ্যতে আমরা একত্রে থাকব।

কিছুক্ষণের মধ্যে ডিপার্টমেন্টের শিক্ষকবৃন্দ সেখানে উপস্থিত হলেন। কুরআন তিলওয়াত ও গীতা পাঠের মধ্যে দিয়ে অনুষ্ঠান শুরু হলো। এরপর আমরা প্রত্যেকে নাম ও পরিচয় সকলের সামনে তুলে ধরলাম। উপস্থিত সব শিক্ষকবৃন্দ তাদের পরিচয় এবং উপদেশ দিলেন। একাডেমিক কার্যাবলি, সহপাঠ্যক্রমিক কার্যাবলি ও পরীক্ষা পদ্ধতি সম্পর্কেও ধারণা দিলেন। এতে আমাদের ভয়ভীতি চলে যায় এবং অজানা সকল বিষয় পরিষ্কার হয়ে আসে। এছাড়া ক্যাম্পাসে হলরুমেও অভিভাবকদের নিয়েও সভা অনুষ্ঠিত হয়েছিল।

ক্লাস শেষে আমরা অনেকেই দল বেঁধে ক্যাম্পাস ঘুরতে বের হয়েছিলাম। এক দল অচেনা মানুষদের সাথে নিয়ে নতুন পথচলার প্রথম দিন। অচেনা হলেও এখন আমরা সবাই বন্ধু। তাদের ছাড়া এখন ক্যাম্পাসে দিন যেন কাটেই না। ক্যাম্পাসের একপ্রান্তে থেকে অন্যপ্রান্তে সব জায়গায়ই নবীনদের পদচারণায় মুখরিত। এসব থেকে কিছু নতুন বন্ধুও পেলাম। প্রথম দিনের পর প্রায় একটানা পাঁচ দিন ক্লাশ হয়। প্রত্যেক দিনই ক্লাশ শেষে ক্যাম্পাসের নতুন নতুন জায়গা আবিষ্কার করতাম ও এক জায়গায় বসে সকলেই খোশ গল্পে মেতে উঠলাম। কয়েকদিন ঘুরে এই প্রতিষ্ঠানটির ইতিহাস সম্পর্কে কিছুটা ধারণা পেলাম।

জানতে পারলাম “প্রযুক্তির জন্য এসো, প্রবৃদ্ধির জন্য বেরিয়ে যাও” এই বাক্যকে ধারণ করে ১৯৬২ সালে ফোর্ড ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তান সরকার পাঁচটি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করে। এর মধ্যে বরিশাল পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট অন্যতম। তখন তড়িৎ, পুরাকৌশল ও শক্তি এই তিনটি অনুষদ নিয়ে যাত্রা শুরু করলেও বর্তমানে কম্পিউটার, ইলেকট্রনিক্স, মেকানিক্যাল, ইলেকট্রোমেডিকেল ও ট্যুরিজম এন্ড হসপিটালিটি নামের অনুষদ চালু হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটিতে দুইটি সুউচ্চ একাডেমিক ভবন, দুইটি ছাত্রাবাস, একটি ছাত্রীবাস ও একটি স্টার্ফ কোয়াটার রয়েছে। শিক্ষার্থী সংখ্যা সাড়ে সাত হাজারও বেশি।

এছাড়া ক্যাম্পাসের শহীদ মিনার, ল্যাব, লাইব্রেরি, নীল দীঘি, খেলার মাঠ এসব জায়গায় থেকেই শুনতাম বন্ধুদের একেক জনের জীবনের গল্প। আমাদের এসব ছোট ছোট অনুগল্প জুড়েই ক্যাম্পাস জীবনের প্রথম দিনগুলো সূচনা হয়। আশা করি এভাবেই হাসি ও আনন্দে কাটবে কলেজের দিনগুলো।

Print Friendly and PDF

সর্বাধিক পঠিত