আমার কথা

পৃথা প্রণোদনা(১৭), ঢাকা

Published: 2019-08-05 18:43:15.0 BdST Updated: 2019-08-05 18:43:15.0 BdST

বন্ধুত্ব শব্দের অর্থ কী বয়সের সাথে বদলায়? হয়তো তাই।

ছোট থাকতে মনে করতাম যেই মানুষটা শুধু পুতুল খেলার সঙ্গী, সেই হয়তো আমার বন্ধু। যখন আরেকটু বড় হলাম মনে করলাম, যেই মানুষটার কাছ থেকে কেবল দিন শেষে স্কুলের বাড়ির কাজ সংগ্রহ করা যায় সেই হয়তো বন্ধু।

তবে এখন যখন এই কথাগুলো চিন্তা করি, তখন বুঝতে পারি ছোটবেলা ও বড়বেলার পার্থক্যটা। এখন আমার কাছে বন্ধু শব্দটি হলো আস্থা, বিশ্বাস, আনন্দ ও সাহায্যের জায়গা।

আসলে অন্য সম্পর্কগুলো আর বন্ধুত্বের মধ্যে মূল পার্থক্য হলো এই সম্পর্কে কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। এই পুরোটাই মনের মিল। এই মিল একেক বন্ধুত্বের সঙ্গে একেকরকম হয়। ঠিক এই কারণেই বন্ধু বিভিন্ন রকম হয়। আমার জীবনে এরকম সাত জন বন্ধুকে আমি খুঁজে পেয়েছি। এদের একেক জনের সাথে আসার আস্থা, বিশ্বাস ও আনন্দের জায়গাটা একেকরকম। এরা হলো-রোজা, মাইমুনা, উৎস, আলভী, আনাহিতা ও সুদীপ্ত।

রোজাকে যেদিন আমি কলেজে প্রথম দেখি, তখন ভেবেছিলাম এই মেয়েটা ছোটবেলায় কোনো ‘পুষ্টিকর পাণীয়’ খেয়ে এতো লম্বা হয়েছে? কলেজে আসার পর এই মেয়েটির সাথেই যে আমার বন্ধুত্ব হবে তা আমি খুব ভালো করে বুঝতে পেরেছিলাম। রোজার সাথে আমার চিন্তাধারা বেশ মেলে। এজন্য আমরা একজন আরেকজনকে খুব ভালোভাবে বুঝতে পারি। আমি কোনো কথা রোজাকে না বলতে চাইলেও, একটা সময় সে ঠিক ধরে ফেলে আমি কী ভাবছিলাম। আমাদের দুইজনকে পাশাপাশি দেখলে সবাই বেশ হাসে। এর কারণটা হলো রোজা বেশ লম্বা আর আমি খাটো। কলেজের শুরু থেকেই রোজা আমাকে একটা নাম দেয়,‘পিচ্চি’ আর আমি রোজাকে বলি ‘লম্বু।’ আমাদের বন্ধুত্বটা লম্বু-পিচ্চি নামেই কলেজের সকলের কাছে পরিচিত। সারাদিন বাদরামি, দুষ্টামি করলেও, দিনশেষে আমার সব বন্ধুদের মধ্যে এই মানুষটাকে আমি সবচেয়ে বেশি ভয় পাই। কারণ জানি যে, কোনো এলোমেলো কাজ করলেই লম্বুর কাছে ঝারি খাবো, রাগ করবে আমার সাথে! মোট কথা, লম্বু কলেজে আমার একজন অভিভাবক, যাকে আমি পরিবারের অন্যদের মতো সবসময় পাশে পাই। তাই সবসময় লম্বুর প্রতি ভালোবাসার পাশাপাশি এক ধরনের সম্মানবোধ কাজ করে আমার।

মাইমুনা আমার আরেক বন্ধু। যে বন্ধু হিসেবে এই মানুষটাকে পাশে পাবে, সেই একজন সুখী মানুষ। এই সুখী মানুষগুলোর মধ্যে আমি একজন। মাইমুনা খুব নরম মনের একটি মেয়ে। আমার মন খারাপ হলে বা ভালো না লাগলেই আমি এই মানুষটাকে খুঁজি। কারণ আমি জানি যে মাইমুনাকে ফোন দিলেই ফোনে ‘হ্যালো’ বলার আগেই যেই শব্দটি হবে, সেটা হলো ‘হাহা।’ কোনোদিন আমি অসুস্থ হলে, ফোন দিয়ে যদি ওকে বলি যে আমি অসুস্থ, খুব হাসাহাসি করে বলবে, ভালো হয়েছে একদম।’ একটু পর আবার মেসেজ পাঠিয়ে বলবে, ওষুধ খেয়ে নে। পরেরদিন কলেজে আসলেই মাথায় হাত দিয়ে বলবে জ্বর কমেছে। সারাদিন বাদরামি আর হাহা করলেও দিন শেষে বুঝি যে বন্ধুত্বের আরেক নাম দায়িত্ববোধ।

উৎস আমাদের বন্ধু মহলে ‘উৎস দাদা’ নামে পরিচিত। কলেজের প্রথম দিকে উৎস’র সাথে আমার কথায় কথায় ঝগড়া হতো। মাঝে মাঝে মনে করতাম এই ছেলেটা এমন অদ্ভুত কেন? কোনো মজা করা যায় না এই ছেলেটার সাথে, একটুতেই রেগে যায়। কয়েকদিন রাগ করে কথাও বলতাম না উৎস’র সাথে। উৎস এখন আমার ভালো বন্ধুগুলোর একজন।

এই ছেলেটার কাছে এখন যেকোনো ধরনের সমস্যা নিয়ে হাজির হওয়া যায়, আস্থা রাখা যায়।

আলভী। আলভী খুব মজার ‍মানুষ। অভিনয়ও ভালো পারে। বন্ধুরা সব একসাথে আড্ডা দিলে আলভীর অভিনয় দেখে হাসতে হাসতে চোখ দিয়ে পানি বের হয়ে যায়। টিফিন টাইম বা যখনই আমরা একসাথে হই এরকম মজার গল্প শুনিয়ে আমাদের আনন্দ দেয়। আমাদের বন্ধু মহলে আমার আর আলভীর বড় হয়ে ডাক্তার হওয়ার ইচ্ছা। তাই সবসময় বায়োলজি বিষয়টি নিয়ে আমরা প্রতিযোগিতায় নেমে যাই। আর সবসময় আলভী আমাকে বলে, ‘তুই তো পাগল, যদি ডাক্তার হয়েই যাস, তাহলে নিজে আগে নিজের চিকিৎসা করিস।’

প্রথমদিন কলেজে যেয়েই জানতে পারলাম আনাহিতা আমাদের এলাকায় থাকে, তখন খু্ব খুশি হয়েছিলাম যে এলাকার একটা বন্ধু পেয়েছি। একসাথে কলেজে যাতায়াতও করতে পারব। আনাহিতা আমার রিকশা পার্টনার। আনাহিতা কলেজে না গেলে বেশ মিস করি! রিকশায় একা একা বাসায় আসলে মনে হয়, কলেজটা অনেক দূর। আনাহিতা আর আমি একসাথে রিকশায় আসলে, আড্ডা দিতে দিতে কখন যে পৌঁছে যাই বাসায়, টেরই পাওয়া যায় না!

সুদীপ্ত আর আমার সম্পর্কটা ভাই-বোনের। সুদীপ্তর সাথে পরিচয় হওয়ার পর ও বলত, ‘তুই তো আমার মেলায় হারিয়ে যাওয়া বোন!’ ও এমন একজন বন্ধু, যার কাছ থেকে আমরা শিখেছি কীভাবে জীবনে প্রতিনিয়ত লড়াই করে বেঁচে থাকতে হয়। তোর পাশে আমরা সবাই কতটুকু থাকতে পেরেছি জানি না, তবে আমরা সবাই সবসময় চাই তুই হাসিখুশি থাক, ভালো থাক।

এই প্রত্যেকটা মানুষের সাথে আমার একটা আত্মিক টান রয়েছে। আমরা অনেকেই ভাবি বন্ধুত্বটা আসলে কী? কে আমার আসল বন্ধু? আসলে যে মানুষগুলো জীবনের প্রতি ভালো লাগা, আনন্দ, শ্রদ্ধাবোধ জাগ্রত করতে পারে, তারাই বন্ধু।

কলেজ জীবন প্রায় শেষের দিকে। ভাবতেই গায়ে কাঁটা দেয়। এই মানুষগুলোর সাথে আর প্রতিদিন দেখা হবে না। টিফিন টাইমে একসাথে বসে আড্ডা, আলভীর অভিনয়, একে অন্যেকে কোনো কারণ ছাড়াই একটা দোষ বানিয়ে শিক্ষকের কাছে ধরিয়ে দেওয়া, একজন চেয়ারে বসার আগেই পেছন থেকে চেয়ারে পানি ঢেলে তার প্যান্ট ভিজিয়ে দেয়া, লম্বু, আমার আর মাইমুনার কলেজ ক্যাম্পাসে একসাথে গান গাওয়া…।

এই প্রত্যেকটা বন্ধু আমার জীবনে খুব দামি। কারণ আমি জানি আজ যদি কোনো কারণে মন খারাপ থাকে, পরের দিন সকালে কলেজে গেলেই, আমি না চাইলেও আমার মুখে হাসি ফুটবে এই মানুষগুলোর কারণে!

Print Friendly and PDF

সর্বাধিক পঠিত