আমার কথা

নূর তাসনিম নাদিয়া (১৬), ঠাকুরগাঁও

Published: 2019-03-13 21:11:39.0 BdST Updated: 2019-03-13 21:11:39.0 BdST

ঘুরে বেড়াতে আমার খুব ভালো লাগে। আর এবারই প্রথম সুযোগ এলো কলেজ থেকে শিক্ষা সফরে যাওয়ার। তাই লোভ সামলাতে পারলাম না।

ভেবে ভেবে আনন্দে কয়েকদিন ঘুমই হয়নি। এই মাসে এক শুক্রবার সেই মাহেন্দ্রক্ষণ এলো। খুব সকালে আব্বু আসলেন নতুন কাপড় আর আমার স্মার্টফোন নিয়ে।

আম্মু প্রথমে অবশ্য নতুন কাপড় বা ফোন কোনোটাই আমাকে দিতে চাচ্ছিলেন না। সব নষ্ট করি ফেলি কিনা!

কিন্তু বাকিটা আব্বুই ব্যবস্থা করলেন। তারপর কলেজে গিয়ে দেখি সার ধরে চারটা বাস দাঁড়িয়ে আছে।

বান্ধবী দিশা, নিতু, সিন্থি আর আমি একই বাসে উঠে বসলাম। বাসে গান বাজানোর ব্যবস্থা ছিল, যেটা আমাদের আনন্দকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল। এরপর চলতে শুরু করল বাস, তবে আমরা কেউই জানি না কোথায় যাচ্ছি। স্যাররা আগে থেকে আমাদের কিছুই বলেননি। এরই মধ্যে গানের তালে তালে শুরু হয়ে গেছে নাচ। যার যত প্রতিভা ছিল সেদিন এই সুযোগে দেখা গেল। এক পর্যায়ে সবার সঙ্গে আমি নিজেও নেচে ফেললাম।

বিশাল একটা ব্রিজ পাড়ি দেওয়ার পর চোখ আটকে গেল হাজী দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের গেটের দিকে। বাহির থেকে দেখলাম বিশাল ক্যাম্পাস। আর মনে মনে ভাবছিলাম ইসস.. এখানে যদি পড়তে পারতাম! এভাবেই দেখতে দেখতে দিনাজপুরের কান্তাজির মন্দিরে হাজির হলো আমাদের দল। দেখে তো সবাই অবাক হয়ে গেল। অনেক পুরাতন এই মন্দিরটি বিশাল আকৃতির। এর গায়ে আঁকা চিত্রগুলো আমাকে সবচেয়ে বেশি অবাক করেছে। মাটির টেরাকোটা দিয়ে চিত্রের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে রামায়ণ আর মেঘনাদবদ কাব্যের কাহিনী। সেগুলোর সাথে আমাদের পরিচয় করিয়ে দিচ্ছিলেন মন্দিরটির একজন পুরোহিত।

বেশ কিছু সময় সেখানে কাটিয়ে আবার বাসে উঠতে হলো। এরপর যাত্রা রামসাগরের দিকে। বাস থেকে নেমেই বিশাল লাইনে দাঁড়িয়ে সকালের খাবার নিয়ে সেটা খেয়েও নিলাম। পেট পূজো সবার আগে।

 

তারপর বিশাল এলাকা ভ্যানে করে ঘুরে ঘুরে দেখলাম। বিশাল একটা দীঘির নামই রামসাগর। যেটি ১৭৫০ থেকে ১৭৫৫ সালে রাজা রামনাথ খনন করেন।

কথিত আছে, প্রচণ্ড খরায় জলের অভাবে অনেক লোক প্রাণ হারায়। এরপর রাজা প্রচুর শ্রমিক নিয়োগ করে একটি দীঘি খনন করেন। কিন্তু কিছুতেই দীঘিতে পানি আসছিল না।

এরপর রাজা স্বপ্ন দেখেন দীঘিতে যুবরাজের প্রাণ বিসর্জন দিলে পানি উঠবে। স্বপ্নের আদেশ অনুযায়ী নাকি যুবরাজ দীঘিতে প্রাণ বিসর্জন দেন। তারপরই পানিতে ভরে ওঠে দীঘি। আর সেই থেকে দীঘির নাম হয় রামসাগর।

রাজা রামনাথের বাড়িতেও গেলাম আমরা। পুরনো ভাঙা ছোট্ট একটা বাড়ি, সংস্কারের অভাবে নষ্ট হচ্ছে। দেখে মনটা খারাপ হয়ে গেল সবার। প্রাচীন জিনিসগুলো আমাদের সংরক্ষণ করা উচিত।

দুপুর গড়িয়ে তখন বিকেল। রামসাগরের একপাশে চলছে ঠাকুরগাঁও সরকারি মহিলা কলেজের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। একে একে পরিবেশিত হল নাচ, গান, অভিনয় আর কৌতুক। তারপর এলো লটারি। ভাগ্যের চাকা ঘুরবে কিনা জানি না, তবুও তিনটি লটারি কিনেছিলাম। একে একে দিশা, নিতু, সিন্থি সবাই লটারিতে কিছু না কিছু পেল।

আমি তখন আশা ছেড়ে দিয়েছি আর ঠিক সেই সময় ঘোষণা আসে আমিও জিতে গেছি লটারি। এটাই আমার জীবনের প্রথম লটারি জেতা। এ তো আনন্দকে আরও বহুগুণে বাড়িয়ে দিয়েছিল। পরিচিত সবাইকে জানিয়েছি এই খুশির খবর। সারাজীবন লিখে স্মরণ রাখার মতো একটা ঘটনা।

এভাবেই দুর্দান্ত শিক্ষা সফরটি শেষ হয়। আবার বাসে নাচতে নাচতে ঠাকুরগাঁও আসলাম রাত আটটায়। স্যাররা দায়িত্ব নিয়ে সবাইকে যার যার বাসায় পৌঁছে দিয়েছিলেন। দিনটি আসলেই ভোলার মতো নয়।

Print Friendly and PDF

সর্বাধিক পঠিত