আমার কথা

শেখ আব্দুল্লাহ ইয়াছিন (১৬), চট্টগ্রাম

Published: 2019-02-07 16:49:56.0 BdST Updated: 2019-02-07 16:49:56.0 BdST

কলেজ জীবনের শুরুর দিকটা ছিল খুব বিরক্তকর। সকাল সকাল উঠে বাস ধরাটা আরো বেশি কষ্ট দিত। আর স্যারদের টানা সাত ঘণ্টার লেকচার তো আছেই।

লেকচার শুনতে শুনতে কোন এক ফাঁকে হারিয়ে যেতাম ঘুমের রাজ্যে, স্যারের ডাকে আবার ফিরে আসতাম ক্লাস রুমে। শুধু আমি নই, ক্লাসে প্রতিটা ছাত্রছাত্রীর অবস্থা একই। সময়টা যেন কাটত না। এ নিয়ে বকা কম খাইনি জীবনে।

স্কুলে থাকতে আমি রোজই স্কুলে যেতাম, কী বৃষ্টি, কী অসুস্থতা কিছুই আমাকে আটকে রাখতে পারত না? তাই স্যাররা আমায় খুব ভালোবাসতেন। ভাবতে অবাক লাগে, যে আমি খুব বেশি অসুস্থ না হলে, কারো বারণ থাকা সত্ত্বেও স্কুলে চলে যেতাম, সে আমি কলেজে উঠে আম্মুর কাছে বায়না ধরলাম, আমি কলেজ যাব না।

আম্মু বলতেন কলেজ জীবনের শুরু এটা, তাই সব নতুন লাগছে আস্তে আস্তে সব ঠিক হয়ে যাবে। একই কথা বারবার ক্লাস টিচারও ক্লাসে বলতেন। কিন্তু কার কথা কে শোনে? আমি মন বসাতেই পারতাম না। 

কলেজে কুইজ টেস্ট শুরু হলো। একটা কাজে ঢাকায় থাকায় আমি যুক্তিবিদ্যা পরীক্ষাটা দিতে পারিনি। তাই পরবর্তী ক্লাসে যুক্তিবিদ্যা বিষয়ের ম্যাডাম লুৎফর নেসা ক্লাসে আমায় বললেন পেছনে বসে পরীক্ষাটা দিয়ে দিতে।

প্রশ্ন হাতে নিয়ে চোখ ছানাবড়া অবস্থা। প্রথমত, যুক্তিবিদ্যা কিছুই বুঝি না তার উপর পড়েও আসি নাই। দ্বিতীয়ত, পরীক্ষার প্রস্তুতি একদম ছিল না, মানসিকও না।

পরীক্ষায় পাস তো করতে হবে, কেমন অস্বস্তি লাগতে শুরু করল। একসময় সাহস করে বন্ধু সাকিবকে ইশারায় না পাড়া প্রশ্নগুলো জিজ্ঞেস করতে লাগলাম। হঠাৎ

দেখলাম টিচারদের ইউনিফর্ম পরা এক আপু আমার ঠি সামনের বেঞ্চেই বসে আছে, আর আমার বন্ধুদের কাছ থেকে জিজ্ঞেস করা দেখে মিটিমিটি হাসছেন। পড়লাম মহা ফ্যাসাদে। ভাবলাম, আরে বাবা ইনি কে? বসেছেন বেঞ্চে আমাদের সঙ্গে, আবার টিচারদের ইউনিফর্ম পরা। অবশ্য কলেজ বাসে কদিন দেখেছি উনাকে। কিন্তু উনি টিচার হলে অবশ্যই আমাদের সঙ্গে বসতেন না ভেবে উনার সামনেই সাকিবের কাছ জিজ্ঞেস করে করেই পরীক্ষাটা দিলাম।

আমার পরীক্ষা শেষ হলে একটু পর ক্লাসও শেষ হল। ম্যাম বের হয়ে যাওয়ার আগে আমাদের সঙ্গে সেই পেছনে বসা আপুর পরিচয় করিয়ে দিলেন। শুনে তো আমার দফারফা অবস্থা। ম্যাম আগেই বলেছিলেন উনি আগামী সপ্তাহে হজ্জ্বে যাবেন তিনি বললেন, “আজ থেকে আমি না আসা পর্যন্ত উনিই তোমাদের ক্লাস নেবেন।” আমার তখন ধরণী দ্বিধা হও জপা ছাড়া আর কিচ্ছু করার ছিল না।

পরের দিন যথারীতি নতুন ম্যাডাম আসলেন। ক্লাসের শুরুতে আবারো নতুন করে পরিচয় দিলেন, আমরা জানলাম ম্যামের নাম আফিয়া ইরা। তিনি একে একে সবার পরিচয় জানতে চাইলেন।
শুরু হলো ম্যাডামের ক্লাস। সপ্তাহে ম্যাডামের চারটা ক্লাস থাকত। আমরা কেউই তার ক্লাস মিস করতাম না। উনি এত সুন্দর করে কথা বলেন যে আমরা টেরই পেতাম না ক্লাসের সময় কীভাবে চলে যেত।

উনার লেকচারের সময় পিনপতন নীরবতা থাকত ক্লাসে। যে যুক্তিবিদ্যা বিষয়টার কিছুই বুঝতাম না তা অনেকটা সহজ হতে লাগল। ম্যাম পড়ার মাঝে মাঝে বেশ মজাও করতেন।
ম্যাম প্রায় বলতেন, “পড়ালেখাকে বোঝা বোঝা মনে করো না, বুঝে পড়লে দেখবে সহজ হয়ে গেছে। আমি তোমাদের টিচার নই, তোমাদের বন্ধু, যে কোনো সমস্যা হলে আমায় বলবে।”

পড়া না বুঝলে ম্যামের রুমে গেলে উনি কখনও বিরক্ত হতেন না। খুব সুন্দর করে বুঝিয়ে দিতেন।

ম্যাম,

আপনি তো জানেনই কুইজ টেস্ট পরীক্ষায় আমি পাস করতে পারিনি। কিন্তু মাসিক টেস্টে ২০ এ ১৮ পেয়েছিলাম। ম্যাম আপনি জানলে হয়ত খুশি হবেন যে, আমি বার্ষিক পরিক্ষায় ৭০ পেয়েছি।
ম্যাম বিদায় নেওয়ার দিন আপনি বলেছিলেন, কখনও পেছনে ফিরে তাকাবে না, যত বিপদ আসুক না কেন সত্য বলবে।

শুনেয়েছিলেন আপনার জীবনের গল্প, উত্থান, পতন। ম্যাম শেষ ক্লাসে যে কথাগুলো বলেছিলেন তা আমার সারাজীবন মনে থাকবে।

এত অল্প সময়ে এতগুলো ছাত্রছাত্রীর মন জয় করেছেন আপনি। ম্যাম আপনি আসলেই অনেক ভালো। আপনি আমাদের কথা দিতে বলেছিলেন, আমরা সৎ হবো, ভালো হবো।
ম্যাম কথা দিচ্ছি আমরা আপনার সেই সৎ, ভালো ছাত্র হয়ে উঠব।

দোয়া করবেন ম্যাম।

Print Friendly and PDF

সর্বাধিক পঠিত