আমার কথা

[সঙ্গত কারণে লেখকের নাম ও ছবি প্রকাশ করা হলো না- সম্পাদক]

Published: 2019-01-31 17:30:36.0 BdST Updated: 2019-02-02 17:07:16.0 BdST

ছবিঃ প্রতীকী
আমার জন্ম শিক্ষিত পরিবারে। এখন দশম শ্রেণির ছাত্রী, ব্যাগ কাঁধে, বেণি দুলিয়ে স্কুলে যাই। তবে এই যে আমার প্রজাপতির মতো জীবন তা পেতে আমাকে লড়াই করতে হয়েছে। লড়াইটা গল্পের মতো শোনালেও সেটা সত্যি।

আমি তখন অষ্টম শ্রেণিতে পড়ি। মাত্র ১৩ বছর বয়সে পারিবারিকভাবে আমার কোনো সম্মতি ছাড়াই আমাকে বিয়ে দেওয়া হয়। আমার শারিরীক গঠনের কারণে বয়স অনুযায়ী আমাকে বড় দেখায়, সেই কারণে প্রায় বিয়ের প্রস্তাব আসতো বাড়িতে। অনেকেই বাবা মাকে বোঝাতেন, “মেয়ে মানুষ বিয়ে তো দিতেই হবে, দিয়ে দাও।”

আমার বাবা-মাও সাতপাঁচ না ভেবে আমাকে বিয়ে দিয়ে দেন আমার এক আত্মীয়ের ছেলের সঙ্গে।

বিয়ের আগে তারা আমার বাবা মাকে বলেছিলেন, “আমরা এত ছোট মেয়ে নেব যেহেতু তাকে আমরা আমাদের মেয়ে বানিয়ে রাখব, পড়ালেখা করাবো।”

এসব মিষ্টি কথায় ভুলে যান আমার বাবা মা। আর আমিও নিরুপায়, কোনো প্রতিবাদই করতে পারি না। বাবা মার সিদ্ধান্তে বসে পড়ি বিয়ের পিঁড়িতে।

বিয়ে হয়েও যায়। এরপর শুরু হয় আমার কষ্টের জীবন, নেমে আসে ঝড়। আমার যার সঙ্গে বিয়ে হয় তিনি আমার চেয়ে দশ বছরের বড় ছিলেন। কোনোভাবেই তাকে বোঝাতে পারতাম না আমার মানসিক ও শারীরিক সমস্যাগুলো।

যেহেতু আমাদের সমাজে শেখানো হয় মেনে নিতে এবং সেক্ষেত্রে আমাকেও শেখানো হলো, মেনে নাও, মানিয়ে নাও।

বিয়ের আগে আমার বাবা মাকে দেওয়া কোনো কথাই তারা রাখলেন না। আমার স্কুল বন্ধ হয়ে গেল, বদলে হাতে উঠে এলো হাঁড়ি পাতিল আর ঝাড়ু।

আমাকে দিয়ে ঘরের যাবতীয় কাজ করানো হতো। যে বয়সটা আমার স্কুলে যাওয়ার, হাসি খুশি থাকার সে বয়সে আমার মাটির চুলায় ভাত রান্না করতে হতো, বড় হাঁড়ির ভাত থেকে মাড় ঢেলে আলাদা করতে হতো। অনেক দিন এমন হয়েছে যে মাড় পড়ে আমার হাত-পা পুড়ে গেছে, কিন্তু ভাত পড়েছে বলে আমার বকা শুনতে হয়েছে।

এই পোড়া হাত নিয়ে ৫০ কেজির চালের বস্তা ঘরে এনেছি, বাজার টেনেছি। দুঃখ কী বেশি বলছি? নাহ বেশি নয়, ধৈর্য নিয়ে শুনুন, তবেই না বাঁচবে আমার মতো আরেক কিশোরী! 

যার সঙ্গে বিয়ে হয়েছিল তার একটা ছোট বোনও ছিল। আমি অষ্টম শ্রেণিতে পড়তাম আর সে ষষ্ঠ শ্রেণিতে। আমার চেয়ে দুই বছরের ছোট। সে ব্যাচে প্রাইভেট পড়তে যেত, তাকে বাসায় দুই জন শিক্ষক এসে পড়াতেন। শুধু আমারই স্কুলে যাওয়া বারণ ছিল। খাবার-দাবারের ক্ষেত্রেও তাকে ভালো খাবারগুলি দেওয়া হতো। আমায় মেপে খেতে দেওয়ার প্রথা ছিল।

আমি তখন ভাবতাম আমারও তো স্কুলে যেতে মন চায়। আমিও তো কারো মেয়ে, আমার ও তো এসবের অধিকার আছে।

ও বাড়িতে কেউ ছিল না যার পাশে গিয়ে একটু বসতে পারতাম। আমার যার সঙ্গে বিয়ে হয়েছিল তাকেও কিছু বলা যেত না। বললেই গায়ে হাত তুলতেন। এছাড়া অকথ্য ভাষায় গালাগালি তো ছিলই। মাত্র আট মাসের বিবাহিত জীবনে আমি যেন শত বছরের নরক বাস করলাম।

আর প্রতিবেশীদের আমার শাশুড়ি বলতেন, আমি বেয়াদব। কথা শুনি না। আমি ঘরে হাত ধুয়ে শুধু ভাতটাই খেতে জানি।

তারা আমাকে শুনিয়ে মাঝে মাঝেই বলতেন, ঘরের বউ লেখপড়া শিখলে অন্যের সঙ্গে চলে যাবে, স্বামীকে দাম দেবে না, চরিত্রহীন হয়ে যাবে।

আমাকে বাড়ি যেতে দিতেন না তারা। বলতেন, মায়ের বাড়ি গেলে মেয়েরা খারাপ হয়ে যায়। আমার সংসার ভাঙবে, বিভিন্ন কুবুদ্ধি দেবে আমার বাড়ির লোকে।

এতকিছুর পরও বাসায় কিছু বলতে পারতাম না। মনে হতো আম্মু আব্বু আমাকে বিশ্বাস করবেন না। মাঝে মাঝে মরে যেতে ইচ্ছে হতো। কিন্তু ওই যে জেদ! ওই যে বেণী দুলিয়ে স্কুলে যাওয়ার স্বপ্ন, আমাকে বাঁচিয়ে রাখত।

এরমধ্যে আমার জেএসসি পরীক্ষা চলে আসে। আমি তো আর আমার এক বছর নষ্ট করতে পারি না। আর আমার বাবা মাও জানতেন আমি পড়ালেখা চালাচ্ছি।

পরীক্ষার কদিন আগে আমি বাবার বাসায় এসে বলি, ওইখানের টিচারটা ভালো পড়াচ্ছেন না। আমাকে একটা টিচার রেখে দাও। তাছাড়া জেএসসির হল এইখান থেকে কাছে হবে। আমি কদিন এখানেই থাকব।

আমার বাবা মা তাই করেন। আমি মাত্র দেড় মাস পাই পড়ালেখার জন্য। পরীক্ষাও মোটামুটি ভালো দেই, জিপিএ ৪.৫০ নিয়ে পাশও করি।

পরীক্ষার পর আমাকে আবার নিয়ে যায়। অত্যাচারের মাত্রা কমে না। সঙ্গে শুরু হয় যৌতুকের অত্যাচার। দিন দিন অত্যাচার বাড়তেই থাকে।

আর সহ্য করতে পারি না।  প্রচণ্ড অসুস্থ হয়ে যাই। কাজ করতে পারতাম না বলে শুরু হয় নতুন ক্যাচাল।

আমি বিভিন্নভাবে জীবন যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছিলাম। আমি ভাবতে শুরু করলাম, আমাকে এখান থেকে বের হতে হবে। আর কোনোভাবেই সম্ভব নয়।

আমি বাড়ি চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। তখনও জানতাম না মা বাবা আমাকে সাপোর্ট করবেন কীনা।

তবুও বাড়ি ফিরে যাই। তাদের সব কিছু খুলে বলি। মা বাবা খুব কষ্ট পান আমার কথা শুনে। কেন আগে বলিনি বলে রাগও করেন।

বাবা-মা নিজেরাই এই ভুল শুধরে নিয়েছেন এখন। আমি সে বন্ধন থেকে চিরতরে মুক্তি পেয়েছি।

তবে ভুলটা শুধরে নেওয়া কিন্তু সমাধান না। যতই ভুলটা শুধরে নেওয়া হোক আমার মতো মেয়েরা সারাজীবন তাদের অতীত ভেবে কষ্ট পেতে থাকে। সমাজ তাদের ছোট চোখে দেখে। এখনো পর্যন্ত স্কুলে মেয়েরা আমাকে কষ্ট দিয়ে দিয়ে কথা বলে। তবে কিছু করার নেই। আমরা সমাজের খাই না, সমাজ কী বলল তা নিয়ে ভাবা ছেড়ে দিতে হবে। সমাজ কি আমি যখন কষ্ট করেছি আমার সাথে এসে কষ্ট করেছিল? না করেনি। কত রাত নীরবে কেঁদেছি আমি জানি। এখন আমার একমাত্র লক্ষ্য আমার ক্যারিয়ার। আমি সফল হবোই। আমি আমার সাহস হারিয়ে ফেলিনি। আমি জিতবোই।

আমি আর দশটা স্বাভাবিক মানুষের মতো জীবন-যাপন করব।

বাল্যবিবাহ এখন বাংলাদেশে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এই নিয়ে কঠোর আইনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। বাল্যবিবাহ আমাদের সকলের রোধ করতে হবে। নারী শিক্ষার প্রতি গূরত্ব দিতে হবে। সবাইকে এটি রোধে এগিয়ে আসতে হবে। যে শিশু এই নির্যাতনের শিকার হবে তাকেই এগিয়ে আসতে হবে, নিজেকে নিজের সাহায্য করতে হবে, পুলিশের কাছে যেতে হবে। দরকার হলে পুলিশের সহায়তা গ্রহণ করতে হবে। জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে বেসরকারি সংস্থাসহ বিভিন্ন জেলা-উপজেলা চেয়ারম্যান, মেম্বাররা গূরত্বপূর্ণ এবং উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করতে পারে। জানেন তো বাল্যবিবাহ একটি জীবন নষ্ট করে দেয়!

Print Friendly and PDF

সর্বাধিক পঠিত