আমার কথা

রূপকথা রহমান (১৫), ঢাকা

Published: 2018-08-06 21:54:35.0 BdST Updated: 2018-08-06 21:54:35.0 BdST

দেশ মানে আমার কাছে একটি ভালো লাগা ও ভালোবাসা। ছোটবেলা থেকেই কীভাবে কীভাবে যেন দেশপ্রেমের বীজ বুনেছি নিজের ভেতরে।

নিজের দেশের প্রতি আমার যে ভালোবাসা, তার শুরুটা কোথায় তা এখন চাইলেও মনে করতে পারবো না। যত দূর পর্যন্ত মনে পড়ে, জ্ঞান হবার পর থেকেই নিজের দেশের প্রতি পুষেছি অটুট ভালোবাসা। ছোটবেলায় আন্তর্জাতিক কোনো স্থানে, তা খেলার মাঠে হোক আর জাতিসংঘের সম্মেলনে হোক, নিজের দেশের নাম শুনলে আনন্দে বুক ভরে যেত। সেই অনুভূতির এখনো কোনো পরিবর্তন ঘটেনি বরং তা আরো প্রকট হয়ে উঠেছে বয়সের সাথে।

বড় হলে যখন প্রাথমিক শ্রেণির পরে বাংলাদেশ ও বিশ্ব পরিচয় বই পেলাম, তখন বুঝলাম দেশের সংজ্ঞা কেবল, “আমরা জন্ম থেকে যেখানে বাস করি” সেখানেই শেষ নয়। একটি স্থানকে দেশ হিসেবে গণ্য হতে হলে তার জন্যেও রয়েছে কয়েকটি নির্দিষ্ট মানদণ্ড। বাংলাদেশ তার সবগুলো পূরণ করে একটি পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্রে পরিণত। এজন্য নিজেকে বাংলাদেশের একজন নাগরিক মনে করে গর্বে বুক ফুলে উঠে।

সেই থেকে বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় বই পড়ে যা জেনেছি তা হলো দেশ ওই সার্বভৌম ভূখণ্ড যার নির্দিষ্ট সরকার ও জনসমষ্টি রয়েছে। একে বলা হয় একটি রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান বা রাষ্ট্র যার মূল লক্ষই থাকে বসবাসরত জনসমষ্টির কল্যাণ সাধন।

তবে ছোটবেলার থেকে নিজের দেশ সম্বন্ধে যেসকল ঐতিহাসিক কাহিনী শুনে এসেছি এবং নিজের দেশের প্রতি যেই ভালোবাসা পোষণ করেছি তার বলে আমি বলতে পারব যে আমার রাষ্ট্র যদি আমার কল্যাণ সাধনে ব্যর্থও হয়, তা সত্ত্বেও আমি নিজ দেশের জন্য যেকোনো কাজ করতে পারব এবং আমি জানি এধরণের মনোভাবের অধিকারী কেবল আমি একা নই, আমার সমবয়সী, আমার চেয়ে ছোট-বড় আরো অনেকেরই রয়েছে। এর ফলেই নিজ দেশ ও দেশের মানুষের প্রতি সৃষ্টি হয় এক আলাদা সম্মান ও ভালোবাসা।

“নিজের দেশের জন্য আমি কী করতে পারবো?” প্রশ্নটি যতবারই নিজের মনে আসে ততবারই বিহ্বল হয়ে পড়ি। আমি বর্তমানে নিজের পড়ালেখা চালিয়ে একজন ভালো মানুষ ও নাগরিকে পরিণত হয়ে দেশের প্রতি যেসকল দায়িত্ব ও কর্তব্য রয়েছে তা পালন করতে পারি। নিজের দেশের জন্য নতুন কিছু অনুধাবন করে কিংবা যা পূর্বে থেকে বিদ্যমান রয়েছে তা সফল করতে অবদান রাখতে পারি।

দেশের কোনো অরাজক অবস্থায় দেশের শান্তি ও শৃঙ্খলার জন্যেও কাজ করতে রাজি আমি। আমি একজন ভীতু মানুষ হওয়া সত্ত্বেও দেশের স্বাধীনতা যদি হুমকির মুখে থাকে, আমি জানি আমি ঘরে বসে থাকব না।  তবে, আমি দেশের জন্য যাই করি না কেন, তা অবশ্যই আমার নিজের কাছে যুক্তিযুক্ত হতে হবে কেননা, যুক্তিহীন কাজই ডেকে আনে বিশৃঙ্খলা ও বিভ্রান্তি।

আমার কাছে দেশ বলতে আমি সেই স্থানটিকে মনে করি যেখানে আমার পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতা রয়েছে। যেখানে আমি নিজের মতামত প্রকাশ ও নিজেকে একটি পূর্ণাঙ্গ মানুষে পরিণত করতে পারব। একইসাথে আদায় করতে পারবো একজন মানুষ হিসেবে আমার প্রাপ্য অধিকার।

তবে, এক্ষত্রে আজকে আমি অত্যন্ত ভাগ্যবান যে আমি আজ এমন একটি পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছি যেখানে আমাকে শিক্ষা, চিকিৎসা, নিরাপত্তা, খাদ্য ও বস্ত্র নিয়ে ভাবনা করতে হচ্ছে না। এমনকি যেই ক্ষুদ্র সংখ্যক মানুষ ইন্টারনেটের মতো সুবিধার অধিকারী আমি তাদের একজন।

কিন্তু, দুঃখের বিষয় এখানে যে, আজকে সবাই আমার মতো ভাগ্যবান নয়। আমার বয়সী হাজার হাজার, এমনকি লক্ষ লক্ষ শিশুকে চিন্তা করতে হচ্ছে নিজের খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থানের মতো মৌলিক অধিকারের কথা। তাদেরকে ভাবতে হচ্ছে রাতের খাবারটা তাদের কপালে জুটবে কিনা, শীতের মোটা কাপড়টা জোগাড় হবে কিনা, যেখানে শিক্ষা ও নিরাপত্তার ব্যাপারটি খুবই দূরের এবং তা নিয়ে চিন্তা করাটা নিতান্তই হাস্যকর।

এধরনের শিশুদেরকে মাঝে মাঝে জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করে, তাদের কাছে দেশ কী, দেশের মূল্য ও গুরুত্ব তাদের কাছে কোথায়? তারাও কি বলবে তারা এই দেশটির জন্য সব করতে রাজি? যদি নাও বলে থাকে তবে বেশ অবাক হবো না, কেননা, আমার এবং তার চিন্তাধারার মাঝে রয়েছে বিরাট বড় একটি ব্যবধান। এই ব্যবধান ঠিক কিংবা বেঠিক ব্যবধান নয়, জীবনধারার বৈচিত্রের ফলে স্বাভাবিকভাবেই উৎপত্তি এর।

আজকে যখন মোড়ে মোড়ে প্রতিবাদের সুর, তখন তারা এ বিষয়ে কী ভাবে, তা জানার খুব ইচ্ছে হয় আমার। তাদের কাছে কী কখনো আমাদের জীবনযাপনের কোনো কিছু অর্থহীন মনে হয় না? আমরা কি পেরেছি তাদের মধ্যে দেশপ্রেম জাগ্রত করতে? তারাও কি কখনো আন্তর্জাতিকভাবে বাংলাদেশের নাম শুনে গর্বিত হয়?

আজকে যেখানে একদিনে শিক্ষার্থীরা নিরাপদ সড়কের জন্য আন্দোলন করে , অন্যদিকে সুবিধাবঞ্চিত শিশুরা এ বিষয়ে অবিদিত থেকে যায়, তখন মনে প্রশ্ন জাগে। দেশপ্রেম কি কেবল সুবিধা বা অধিকারপ্রাপ্তদের একটি বৈশিষ্ট্য?

Print Friendly and PDF

সর্বাধিক পঠিত