আমার কথা

হিমেল ইসহাক (১৫), ঢাকা

Published: 2018-08-04 14:27:35.0 BdST Updated: 2018-08-06 14:59:25.0 BdST

একইসাথে কীভাবে সুখ, দু:খ, হাসি, কান্না, রাগ, ঘৃণা, গর্ব, বিরক্তি আরও সব অজানা অনুভূতি এক মুহুর্তে সমগ্র চিন্তাজগত ছেয়ে ফেলতে পারে তা আমার ক্ষুদ্রজীবনে এই প্রথম বোধ করছি।

বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টায় বাসা থেকে বের হলাম, মিরপুর ১৪ এর উদ্দেশ্যে, কোচিংয়ে যাব বলে। বের হয়ে দেখি রাস্তায় কোনো বাস নেই। অবশ্য না থাকারই কথা। যারা আমাদের বন্ধুদের বাস চাপা দিয়ে মেরেছে তাদের বিচার না হওয়া অবধি আন্দোলন তো চলবেই।

তাই হাঁটা শুরু করলাম। কাজিপাড়া এসে রিকশায় উঠব ভাবছিলাম, কিন্তু কেউ যেতে রাজি নয়। কি আর করা! আবার হাঁটা। রাস্তায় যখন দেখছিলাম, আমার বয়সি ছেলে-মেয়েরা গাড়ি থামিয়ে লাইসেন্স চেক করছে, নিজের মধ্যে গর্ব বেশ ফুলে ফেঁপে উঠছিল। আমিও যোগ দিলাম তাদের সাথে। তাদের সাথেই ছিলাম বেশ কিছুক্ষণ।

কিন্তু কোচিংয়ের সময় হয় যাচ্ছে ভেবে আবারও হাঁটা শুরু করলাম। স্যারের বাসা পর্যন্ত হেঁটেই গেলাম। গিয়েছিলাম গুটিকয়েক, তবুও স্যার যত্নসহকারে পড়ালেন। কোচিং শেষ করে হাঁটা ধরলাম আবার।

তখন বাজে সাড়ে চারটা। কাফরুল থানার সামনে এসে দেখি, পুলিশের সংখ্যা অনেক। তাদের চিন্তিত দেখাচ্ছিল। যাবার সময় এখানে প্রচুর ছাত্র ছিল, এখন দেখছি না। পথচারীদের জিজ্ঞেস করলাম, কি হয়েছে? বললো, পুলিশের সাথে আন্দোলনকারীদের ঝামেলা হয়েছে, পুলিশ রাবার বুলেট, লাঠিচার্জ করছে। আমি অবাক! এমনটা হবার কথাই ছিল না। আমি দেখছিলাম আন্দোলন শান্তিপূর্ণভাবে চলছিল। এর মধ্যে যে তৃতীয় কোনো পক্ষ কাজ করেছে তা বুঝতে আর দেরি হয়নি।

পথচারীরা বললো, ঘটনা আধঘণ্টা আগে ঘটছে। এখন সব শান্ত দেখাচ্ছে তাই আমি হাঁটা ধরলাম। পাব্লিক অর্ডার ম্যানেজমেন্টের সামনে আসার পরে, আচমকা পুলিশ ধাওয়া দিল। আমি তখন, ন্যাম গার্ডেন কোয়ারর্টারের সামনে। পুলিশ লাঠি নিয়ে আসছিল, সবাই ভয়ে, আতংকে দৌড়াচ্ছে। আমিও তাদের সাথে। দেখি পিছনেও পুলিশ সামনেও পুলিশ, পাশে কোনো দোকান বা গলি নেই। ভাবলাম দৌড়াব কোথায়! সামনে গেলেও ধরবে, পেছনে গেলেও ধরবে। আমি থামলাম।

আমি ভাবছিলাম, কেবল ভাবছিলাম.. আমি তো এই হামলার সাথে যুক্ত নই! এছাড়া আমাকে কেন ধরবে, আমি তো কোনো অন্যায় করিনি! সে ভাবনাটাই ছিল আমার সবচেয়ে বড় ভুল। আমি একটু ঘরোয়া আর বোকা প্রকৃতির ছেলে। যাই হোক, ঘটনায় আসি। দেখলাম পুলিশ এলোমেলোভাবে লাঠিচার্জ শুরু করেছে। যাকে পাচ্ছে তাকেই মারছে। বিশেষ করে, যাদের কাঁধে ব্যাগ। হঠাৎ আমার দিকে এক সদস্য এগিয়ে এল। আমি হাত তুললাম! কিছু বলতে চাচ্ছিলাম কিন্তু সুযোগ পাইনি, তার আগে প্রচণ্ড গতিতে আমার মাথার একপাশে, কানের উপরে, আর মাথার পেছনে লাঠির বাড়ি বসিয়ে দিল। চোখের পলকে আমি হতভম্ব! চোখে অন্ধকার দেখছি, আমার পুরো দুনিয়া তখন ঘুরছে। সেকেন্ডের মাথায় দিতীয় বাড়ি দিল আমার পিঠে।

সে আর থামলো না অন্যদের ওপরে আবার ঝাঁপিয়ে পড়ল। সেখানে কেবল পুলিশ লাঠিচার্জ করেছে তা কিন্তু না। আমার চোখের সামনে আমি হেলমেট পরা অনেক যুবককে দেখেছি যাদের হাতে পুলিশের লাঠি। এরকম একটি মুহূর্তে পুলিশ সিভিল ড্রেস পরে কেনই বা নামবে, তা আমার অল্প বয়স্ক, গাণ্ডু মাথায় ঢুকল না।

আমাদের নির্বিচারে আঘাত করার দৃশ্য ধারণ করায় চোখের সামনে এক সাংবাদিক ভাইয়ের ক্যামেরা ভেঙে ফেলে তাকেও মারল ওই পুলিশ আর সিভিল ড্রেসে থাকা কিছু অমানুষরা। আমি ভাবছিলাম, এ কোন দেশে জন্মেছি আমি! এরা কারা আবার আমার স্বাধীনতা ছিনিয়ে নিতে চায়! এরা কি জানে না, আমার আদর্শ, জাতির জনক এই দৃশ্য দেখলে সহ্য করতে পারতেন না! 

যাই হোক, মাথায় আঘাতের পরে মাথা কেবল ঘুরছিল, আমার ব্লাড প্রেশার হয়তো বেড়ে গেছে, হাত-পা কাঁপছিল।

আমি শুধু ভাবছিলাম, পুলিশ কেন এমন আচরণ করছে? আমরা তো সহিংস আন্দোলনে যাইনি। যেখানে স্কুল কলেজেই শারীরিক আঘাত নিষিদ্ধ করা হয়েছে সেখানে পুলিশ কি করে আমাদের গায়ে হাত তোলে? আমার সামনে ১০-১২ জনকে তারা মাথায় মেরেছে, যাদের মধ্যে সবাই আমার বয়সী। প্রত্যেকেই নিরীহ। আমি কল্পনাতেও ভাবি নাই, যে পুলিশ এতটা নিচে নামতে পারে! তারা কেমন পশু হলে শিক্ষার্থীদের গায়ে হাত তুলতে পারে! আর তাদেরকে এই শিক্ষাটাও দেওয়া হয়নি যে মাথায় আঘাত করা আর শরীরে আঘাত করার মধ্যে তফাৎ কী? আজ আমি নিজে প্রত্যক্ষদর্শী, ভুক্তভোগী। আমার সহপাঠীরা কোনো বাস ভাঙেনি, তারা কারো উপর হাত তোলেনি, কেবল লাইসেন্সবিহীন গাড়ি ধরছে, রাস্তার শৃঙ্খলা ফিরিয়ে এনেছে।

৪৭ বছরে যা করতে প্রতিটি সরকার ব্যর্থ, আইন শৃঙ্খলাবাহিনী ব্যর্থ, তা শিক্ষার্থীরা করে দেখিয়েছে। আগেই বলেছি, আমি ন্যাম গার্ডেনের সামনে ছিলাম। সেই কোয়াটারের গেট খুলে কিছু পথচারী আমাকে ভেতরে নিয়ে গেলেন। তখন চোখের সামনে কেবল ঘন কুয়াশা, মাথায় অসহ্য যন্ত্রণা। এক আন্টি আমাকে ধরে দুই নাম্বার বিল্ডিং এর ভেতরে বাথরুমে নিয়ে গেলেন। মাথায় পানি দিলেন, মুখ ধুইয়ে দিলেন। আবার আঁচল দিয়ে মাথা মুছিয়ে দিলেন। তারপর সবাই একসাথে কথা বলা শুরু করেছে," এই ছেলে তুমি কি আন্দোলনে গিয়েছিলে? বাসা কোথায়? বাবা কী করে? মাথা ঘুরছে? বাসায় ফোন দিয়েছ? ফোন দিয়ে তোমায় নিয়ে যেতে বলো। এই ছেলে নাম্বার মুখস্ত আছে তো ? ফোন আছে তোমার সাথে?"

তাদের জানালাম, আমি কোচিং শেষ করে বাসায় যাচ্ছিলাম। একসাথে সমবেদনা, উপর্যুপরি প্রশ্ন, কথোপকথনে আর মাথার তীব্র যন্ত্রণায় আমি বিরক্ত এবং আরো অসুস্থ অনুভব করছিলাম। আমি কখনো অন্যের চিন্তার কারণ হতে চাই না। খুব বিরক্ত লাগে! এসবের মাঝে প্রথমবারের মতো চোখ দিয়ে পানি চলে আসল। এক আন্টি বারবার বলছিলেন, বাসায় ফোন দিতে। আব্বুর কথা জিজ্ঞেস করছিলেন।

তাদের তখন কিভাবে বোঝাব যে আমার দেশের বাড়ি ভোলাতে, তারা এখানে থাকেঞ না। আমি এখানে আমার ভাইয়ের সাথে থাকি। ফোনে ভাইয়ের নাম্বার বের করে দিলাম। জানতাম শত চেষ্টা করলেও আমার মুখ দিয়ে কথা বের হবে না। বরং তারাই কথা বলুক। আন্টি বেশ গুছিয়ে কথা বললেন। তখন আরেক আন্টি এসে জিজ্ঞেস করলেন,
তোমার বাসা কোথায়? 
শেওড়াপাড়া।
কোথায় পড়?
বিএন কলেজ।
আমার বাসায় যাবে? চল। ভেবো না তোমার কোনো সমস্যা হবে না। আমি তো তোমারই মা! উনি বাসায় নিয়ে প্রাথমিক চিকিৎসা, ডাক্তারের সাথে কথা বলা, আদর করে খাওয়ানোসহ কোনোপ্রকার যত্ন আর বাকি রাখলেন না। এরমধ্যে ভাই এসে হাজির। সেখানে আর কিছুক্ষণ থাকার পরে জানলাম, বাসার আংকেল একজন সচিব। আর তাদের ব্যবহারে, যত্নে আমি ধন্যবাদ দেওয়ার ভাষা হারিয়েছি। যেতে যেতে ভাবলাম, পৃথিবীতে এখনো কিছু যেমন আছে, তেমন এই ভদ্রমহিলার মতো অসম্ভব ভালো মানুষও আছেন।

এই হলো আমার ১৫-১৬  বছরের জীবনে ঘটে যাওয়া সবচেয়ে মারাত্মক  ঘটনা। একটি অন্ধকার অধ্যায় হয়ে মনে দাগ কেটে থাকবে সারাজীবন।

সেইসাথে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে আবেদন, এসব পুলিশ সদস্যদের চিহ্নিত করুন, এদের বিচার করা লাগবে না আপনার, আমাদের সাথে স্কুল-কলেজে ভর্তি করিয়ে দিন। শিক্ষিত বানিয়ে ছেড়ে দেব ইনশাআল্লাহ। জয় বাংলা।

Print Friendly and PDF

সর্বাধিক পঠিত