আমার কথা

সাদিক ইভান (১৭), ঢাকা

Published: 2018-08-01 20:08:52.0 BdST Updated: 2018-08-01 20:38:47.0 BdST

ছবিঃ ফেইসবুক থেকে সংগৃহীত
প্রিয় প্রধানমন্ত্রী,
আপনি নিশ্চয় খুব একটা ভালো নেই। আমরাও ভালো নেই। কারণ হয়তো জানেন। চোখের সামনে ভাই বোন বাসের ধাক্কায় থেঁতলে গেলে কেউ কি ভালো থাকে?

অভিযোগ, অনুযোগ দিয়ে যখন কোথাও কাজ হয় না, তখন আপনিই আমাদের ভরসা। তাই আপনার উদ্দেশ্যেই এই চিঠি।

বিমানবন্দর সড়কে রোববার বাসের চাপায় আমার এক ভাই ও এক বোন মারা গেছেন।

তাদের মৃত্যুর প্রতিবাদে বিক্ষোভ করছি আমরা। দুর্ঘটনার পর  নৌপরিবহন মন্ত্রীর প্রতিক্রিয়াও আমাদের ব্যথিত করেছে। আমার ভাই মরল, আর উনি হাসলেন?

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেক গুজবও ছড়ায়। কিন্তু অনেক সত্য ঘটনাও এখান থেকে আমরা পাই।

দুর্ঘটনা ও আন্দোলনের পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঘুরে বেড়ানো এসব মর্মস্পর্শী ছবি দেখে আপনিও সহ্য করতে পারবেন না। কারণ আপনি একজন মা, কোনো মায়ের পক্ষেই সন্তানের এমন রক্তাক্ত ছবি সহ্য করা সম্ভব না।

নিরাপত্তা আমার অধিকার। এজন্য আমাকে আন্দোলনে নামতে হচ্ছে এটাই আমার জন্য কষ্টের। কতটা কষ্ট বুকে নিয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে রোদে পুড়ি, বৃষ্টিতে ভিজি জানেন?

এগুলোকে যারা বাচ্চামি বলে তাদের সঙ্গে আমি একমত নই। আমার অধিকার আমি আদায় করে নেব, এতে বাচ্চামির কিছু নেই। আমরা দেশকে নিজের মতো করে গড়ে নিতে চাই, দেশটা আমাদের।

আপনি লক্ষ্য করলেই দেখবেন আমাদের এই আন্দোলনের ধরনটা চমৎকার। অনেক জায়গায় শুনলাম পুলিশকে ফুল দিয়ে তাদের সহযোগিতা চেয়েছে আমার বন্ধুরা। রাস্তায় পড়ে থাকা বাসের ভাঙা গ্লাসগুলো পরিষ্কার করে দিচ্ছে কিন্তু শিক্ষার্থীরাই।

আন্দোলনের ভেতর ঢুকে বাস ভাঙে কিছু দুর্বৃত্ত। তাদেরকে ধরে পুলিশেও দিয়েছে শিক্ষার্থীরা। বলুন এতটা মানবিক সন্তান নিয়ে আপনার গর্ব হয় না?

আপনি জানেন কি না জানি না শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলনে পুলিশের কিছু সদস্য অসৌজন্যমূলক আচরণ করেছে। আমাদের আঘাতও করেছে।  রক্তে ভিজে গেছে আমার ভাইয়ের স্কুল ইউনিফর্ম।

মিরপুর পুলিশ স্মৃতি কলেজের এক ছাত্রকে রাইফেল দিয়ে মাথায় আঘাত করেছে পুলিশ। এসময় ওই ছাত্রের সাদা স্কুল ড্রেস আর জুতা জোড়া রক্তে লাল হয়ে যায়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এক ছবিতে দেখলাম এক শিক্ষার্থীর শার্টের কলার চেপে ধরে রেখেছে পুলিশ। শিক্ষার্থীদের জোর করে পুলিশ ভ্যানে টেনে নিয়ে যাওয়ার চিত্রও দেখেছি।

চুরি ডাকাতি করে কেউ কেউ হজে চলে যায় আর বোন ভাই হত্যার বিচার চাইলে জেলে যেতে হবে কেন বলুন তো?

পুলিশকে কেন এমন আচরণ করছে? আমরা তো সহিংস আন্দোলনে যাইনি। যেখানে স্কুল কলেজেই শারীরিক আঘাত নিষিদ্ধ করা হয়েছে সেখানে পুলিশ কি করে আমাদের গায়ে হাত তোলে? আমরা যদি দেশের ভবিষ্যৎ হই তাহলে এই আঘাত কি দেশের গায়ে আঘাত নয়?

গণমাধ্যমের আরেকটি খবর জেনে কষ্ট পাবেন যে, বুধবার সকালে শনির আখড়ায় আন্দোলনের সময় এক শিক্ষার্থীকে চাপা দিয়ে পিকআপ নিয়ে পালিয়েছে চালক। শুধু তাই নয় নারায়ণগঞ্জে এক ছাত্রসহ চার কিশোরকে মারধর করে পুলিশে দিয়েছে পরিবহন শ্রমিকরা।

আমরা নিরাপত্তা চাই আপনার কাছে। এ জন্য আজ ছাত্ররা রাজপথে। একের পর এক ঘটনা ঘটতে থাকায় সকলের পিঠ ঠেকে গেছে দেয়ালে।

কিছুদিন আগেই তিতুমীর কলেজের ছাত্র রাজীবকে বাসের চাপায় হাত হারাতে হলো। তাকে আমরা বাঁচাতেও পারিনি। এরপর যোগ হলো নর্থসাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র পায়েলের নাম। এরপর রমিজউদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের করিম ও মিম। যে ঘটনার পর ফুঁসে উঠেছে ছাত্র সমাজ।

এই আন্দোলনের মধ্যেই মঙ্গলবার ঘটে গেছে আরেক ঘটনা। কুমিল্লায় দশম শ্রেণিতে পড়ুয়া আকলিমা ট্রাক চাপায় মারা গেছে। ফুটপাতে উঠে গিয়েছিল ট্রাক।

আমাদের অসচেতনতা আছে সেটা আমরা স্বীকার করে নিচ্ছি। কিন্তু ফুটপাতে দাঁড়িয়ে থাকলেও গাড়ি কেন গায়ে উঠে যাচ্ছে? দয়া করে ব্যবস্থা নিন৷  দ্রুত একটা প্রকল্প হাতে নিয়ে চালকদের বিশেষ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করুন। ছাত্রদের নয় দফা আমলে নিন।

বুধবার বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদের গাড়ি শাহবাগে উল্টা পথে যাচ্ছিল৷ ছাত্ররা মন্ত্রীকে ফিরিয়ে দিয়েছে। শুধু তাই নয় লাইসেন্স নেই বলে ধানমণ্ডিতে পুলিশের গাড়িও আটকে দিয়েছে তারা।

এই ছাত্ররা কাল বড় হবে। আজ তারা বিচার চেয়ে বিচার না পেলে, কাল নিজে অপরাধ করে বলবে আমার ভাই-বোন হত্যার বিচার পাইনি সেদিন। সুতরাং আমলে নিন, অবহেলা করবেন না।

কোনো নেতা নাই, নির্দেশনা নাই, উস্কানি নাই, রাজনৈতিক মতলবও নাই শুধুমাত্র সড়কে শৃঙ্খলার জন্য চিৎকার করছে শিক্ষার্থীরা। তাদের প্রতি মানুষের নৈতিক সমর্থনও আছে। কারণ সবার ঘরেই সন্তান আছে। 

এক আংকেলকে বলতে শুনলাম, "রাস্তা ব্লকড, প্রয়োজনে হেঁটেই অফিস করব৷ তবুও চলার পথ নিরাপদ হউক।"

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনার হৃদয় ছুঁয়ে যাবে এই ছেলে-মেয়েদের প্ল্যাকার্ডগুলো দেখলে। কেউ লিখে এনেছে, ‘ছাত্ররা হেরে গেলে হেরে যায় দেশ’। কেউ লিখেছে, ‘আমরা যদি না জাগি মা কেমনে সকাল হবে?' আরেকজন নৌপরিবহন মন্ত্রী শাহজাহান খানকে উদ্দেশ্য করে লিখেছে ’৩৩ জন হলে হবে তো?’ 

তাদের প্রতিটি কথা আপনাকে অবাক করবে৷ একজন কাগজে লিখে এনেছে ‘আমরা নয় টাকায় এক জিবি চাই না, নিরাপদ সড়ক চাই’।

অনেকেই ফেইসবুকে সরব। তাদের স্ট্যাটাসগুলোও জ্বলজ্বলে,  উদ্দীপ্ত। একজন আক্ষেপ করে লিখেছে 'এ দেশে বেঁচে থাকাই দেশপ্রেম।' আরেকজন বিদ্রুপ করে লিখেছে, 'লেখাপড়া করে যে, বাস চাপায় মরে সে।'

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী একটি প্রজন্ম বিরুদ্ধে চলে যাচ্ছে। আপনি যথেষ্ট বুদ্ধিমতি, এটি হতে দিবেন না। আপনার মমতার আঁচলে ছাত্র সমাজকে আগলে রাখুন সবসময়।

Print Friendly and PDF

সর্বাধিক পঠিত