আমার কথা

পৃথা প্রণোদনা (১৫), ঢাকা

Published: 2018-06-06 15:22:46.0 BdST Updated: 2018-06-06 18:19:00.0 BdST

ছোটবেলাতেই পরিবার ও স্কুল থেকে একটি ছেলে ও মেয়েকে বুঝিয়ে দেওয়া হয় তোমরা আলাদা। অর্থাৎ আমরা ছেলে-মেয়ের বৈষম্যটা যে বড় হয়ে শিখি তা কিন্তু নয়।

এ বৈষম্যটা ছোট থেকেই শুরু হয় এবং বড় হওয়ার পর যখন একটি ছেলেকে বলা হয় মেয়েদরকে সম্মান কর, একটা মেয়েও তোমার বন্ধু হতে পারে, তখন একটা ছেলে সহজভাবে এই কথাগুলো নিতে পারে না। তখন একটা মেয়েকে সম্মান করা, তাকে বন্ধু ভাবাটা তার জন্য খুব জটিল হয়ে যায়! এর কারণটা হলো ছোট থেকেই আমাদেরকে একটা বিষয়ে অভ্যস্ত করিয়ে দেওয়া হয় যে ‘ছেলে-মেয়ে আলাদা।’

ছেলে-মেয়ে এক সাথে থাকলে খারাপ হয়ে যায় এই ধারণা আমাদের অনেকেরই আছে। কিন্তু যারা এমনটা ভেবে থাকেন, তাদেরকে বলি কী, আপনাদের এ ধারণাটা সম্পূর্ণ ভুল। আমি নিজে একটা যৌথ স্কুলে পড়ে এসেছি।

আমার কাছে ছোট থেকেই একটা মেয়ে যেরকম আমার বন্ধু, ঠিক একটা ছেলেও তেমনি। এজন্য অনেক সময় আমাকে অনেক ঘটনার সম্মুখীন হতে হয়েছে। আর এ ঘটনাগুলোর সম্মুখীন হওয়ার কারণ আমাদের ভ্রান্ত ধারণা।

আমরা বন্ধুরা যখন বোর্ড পরীক্ষা দিতাম তখন আমাদের প্রত্যেকেরই খুব কষ্ট হতো। কারণ বোর্ড পরীক্ষায় সবসময় মেয়ে-ছেলেদের পরীক্ষার হল আলাদা, পরীক্ষার হলে ঢোকার রাস্তা আলাদা, এমনকি যে সিঁড়ি দিয়ে মেয়েরা নামছে বা উঠছে, ওই সিড়ি দিয়ে ছেলেরা নামতে বা উঠতে পারবে না আর ছেলে-মেয়ে একে অপরের সাথে কথা বলা তো দূরের কথা। এমনটাই নিয়ম। কিন্তু আমরা তো ছোট থেকেই ছেলে-মেয়েরা সব সময় একসাথে কাজ করে এসেছি, তাই আমাদের এমন নিয়ম মানতে খুব কষ্ট হতো। দেখা যেত যে অজান্তেই একে অপরের সাথে কথা বলে ফেলছি।

আর একটা ঘটনা হলো পরীক্ষা শেষ করে আমরা ছেলে-মেয়ে সবাই একটা জায়গায় একসাথে হতাম। তখন দেখতাম আমাদের দিকে অন্য সব শিক্ষার্থীরা তাকিয়ে আছে! কারণ ওই একটাই। তাহলে দেখুন, ছোট থেকেই আমাদের বুঝিয়ে দেওয়া হচ্ছে ছেলে-মেয়ে দুজন দুই ধরনের মানুষ। যাদের কিনা একজন আরেকজনের সাথে মিলেমিশে থাকার অধিকার নেই এবং তাদের চলার রাস্তাও আলাদা। যদি ছোট থেকেই আমাদেরকে এভাবে গড়ে তোলা হয়, তাহলে কীভাবে একটা মেয়ে একটা ছেলেকে সম্মান করবে কিংবা একটা ছেলে একটা মেয়েকে সম্মান করবে?

আমার খুবই অবাক লাগতো যখন আমি টিচারের বাসায় পড়তে গিয়ে দেখতাম যে ছেলে-মেয়ে একসাথে বসতে চায় না। কারণ কী? কারণ হলো ‘ও ছেলে, ওর পাশে বসা যাবে না।’ এ ধারণাটা শিশুদের মনে এমনি এমনি তৈরি হয়নি। তাদের এমন ধারণাগুলোকে তৈরি করে দিয়েছি আমরা, এই সমাজ, এই পরিবার।

আবার ছোটবেলায় যখন মা-বাবা কোন শিশুকে মার্কেটে বা দোকানে নিয়ে যান, তখন মেয়ে শিশুরা বলে, ‘আমাকে একটা বারবি ডল কিনে দাও।’ ছেলে শিশুরা বলে, ‘আমাকে একটা রিমোট কনট্রোল গাড়ি কিনে দাও।’ কিন্তু যখন একটা ছেলে শিশু একটা খেলনা পুতুল বা বারবি ডল কিনতে চায়, তখন বাবা-মা বলেন, ‘ওটা তো মেয়েদের খেলনা। তুমি কেন কিনবে?’ অর্থাৎ, এটা আমাদের মাথায় গেঁথে গেছে যে মেয়ে শিশুরাই কেবলমাত্র বারবি ডল, পুতুল, হাঁড়ি-পাতিল দিয়ে খেলতে পারে, ‍কিন্তু ছেলে শিশুরা পারে না। যাদের এমনটা ধারণা তাদের কাছে একটা প্রশ্ন হলো, যদি ছেলেরা হাঁড়ি-পাতিল দিয়ে খেলতে না পারে, তাহলে বড় হয়ে একটা ছেলে শেফ হচ্ছে কীভাবে? আর একটা মেয়ে যদি গাড়ি দিয়ে খেলতে না পারে, তাহলে বর্তমানে মেয়েরা বৈমানিক হচ্ছে কি করে?

আমার এতোগুলো কথা বলার কারণ হলো আমি ছোট থেকেই ছেলে বা মেয়েকে কখনো আলাদাভাবে দেখিনি। সমাজের মধ্যে যে প্রতিনিয়তই ছোট থেকেই ছেলে-মেয়ের মধ্যে একধরনের বিভেদ সৃষ্টি করা হচ্ছে, তা আমার মেনে নিতে কষ্ট হয়। আমার কাছে আমার একটা মেয়ে বন্ধু ঠিক যেরকম, আমার একটা ছেলে বন্ধুও ঠিক সেরকমই। আমি আমার মেয়ে বন্ধুদেরকে ঠিক যেমন ভালোবাসি, আমার ছেলে বন্ধুদেরকেও ঠিক ততটাই ভালোবাসি।

আমরা যদি ছোট থেকেই শিশুদের মনে এই ধারণাটা তৈরি করতে পারি যে ছেলে-মেয়ে কোন আলাদা ব্যাপার নয়, আমরা প্রত্যেকেই বন্ধু তাহলেই একটা সুন্দর সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব। আর শিশুদের মধ্যে এ ধারণা তৈরি করতে, একটা সুন্দর সমাজ গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজন আপনাদের সবার সহযোগিতা।

Print Friendly and PDF

সর্বাধিক পঠিত