আমার কথা

পৃথা প্রণোদনা (১৫), ঢাকা

Published: 2018-04-16 16:51:11.0 BdST Updated: 2018-04-16 16:51:11.0 BdST

গ্লানি জরা মুছে বাঙালি প্রতিবছর পুরাতন সব দুঃখ-কষ্ট ভুলে স্বাগত জানায় বাংলার নতুন বছরকে। সূর্য ওঠার আগেই গানে গানে মুখরিত হতে থাকে চারদিক। চারপাশ রঙিন হয়ে উঠতে থাকে সুরের মেলায়। লাল-সাদা শাড়ি, পাঞ্জাবি পরে সবাই এই প্রাণের উৎসবকে আরো প্রানবন্ত ও আকর্ষণীয় করে তোলে।

আমাদের সমাজে এখনও অনেকেই রয়েছেন যারা এই নববর্ষকে বাঙালির প্রাণের উৎসব হিসেবে মেনে নিতে নারাজ। শুধু তাই নয়, আমাদের সমাজের এখনো অনেকের ভ্রান্ত ধারণা, পহেলা বৈশাখ কেবলমাত্র সনাতন ধর্মাবলম্বীদের জন্য। আমাদের সমাজের যারা এখনো এরকম ভ্রান্ত ধারনা নিয়ে আছেন তাদেরকে বলি, নিজেকে কেবলমাত্র একজন হিন্দু ‍কিংবা একজন মুসলমান হিসেবে না ভেবে একজন বাঙালি বা দেশের নাগরিক ভাবুন, তাহলেই এই ভ্রান্ত ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে পারবেন।

অতীতে প্রযুক্তির যুগ শুরু না হওয়ায় কৃষকদের ঋতুর উপর নির্ভর করতে হতো। কৃষি পণ্যের খাজনা আদায়ের লক্ষ্যে মুঘল সম্রাট আকবর বাংলা সনের প্রবর্তন করেন। ফসল এবং খাজনা আদায়কে কেন্দ্র করে প্রথমে এই সনের নাম ছিল ফসলি সন, পরে বঙ্গাব্দ বা বাংলা বর্ষ নামে পরিচিত হয়।

পহেলা বৈশাখের আরেকটি আকর্ষণীয় দিক হলো হালখাতা। আগেরদিনে ব্যাবসায়ীরা একটি মোটা খাতায় তাদের যাবতীয় হিসাব লিখে রাখতেন। হিসেবের খাতাটির বৈশাখের প্রথম দিন নতুন করে হালনাগাদ করা হতো। হিসাবের খাতা হালনাগাদ করার এ রীতি থেকে উদ্ভব হয় হালখাতার। হালখাতা এখন শহরে খুব বেশি দেখা না গেলেও, পুরোপুরিভাবে তা বিলুপ্ত হয়নি।

বলা হয় যে, অতীতে জমিদারকে খাজনা প্রদানের অনুষ্ঠান হিসেবে ‘পুণ্যাহ’ প্রচলিত ছিল। বছরের প্রথমদিন  প্রজারা ভালো পোশাকআশাক পরে জমিদার বাড়িতে গিয়ে খাজনা পরিশোধ করেতেন। তাদেরকে সে সময় ‍মিষ্টি খাইয়ে আপ্যায়ন করা হতো।

গ্রামে পহেলা বৈশাখকে কেন্দ্র করে নানা ধরনের আয়োজন করা হয়। এ আয়োজনের মধ্যে থাকে খেলাধুলা, পিঠাপুলির আয়োজন। এ খেলার মধ্যে রয়েছে, লাঠিখেলা, কুস্তিখেলা, মোরগ লড়াই, নৌকাবাইচ ইত্যাদি। এ ছাড়াও সারাদিনব্যাপি চলে বৈশাখি মেলা।

বর্তমানে গ্রামের তুলনায় শহরে পহেলা বৈশাখকে বেশি ঘটা করে উদযাপন করতে দেখা যায়। শহরে পহেলা বৈশাখকে কেন্দ্র করে নানা ধরনের আয়োজন করা হয়। ঢাকার রমনার বটমূলের সংগীতানুষ্ঠান, চারুকলার মঙ্গল শোভাযাত্রা অন্যতম।

তবে শহুরে বৈশাখ নিয়ে প্রাবন্ধিক কবির চৌধুরি তার ‘পহেলা বৈশাখ’ প্রবন্ধে বলেছেন, ‘যে গ্রামবাংলা ছিল পহেলা বৈশাখের আনন্দ অনুষ্ঠানের প্রাণকেন্দ্র আজ অর্থনৈতিক কারণে শহরে বিশেষ করে রাজধানীর ঢাকায়, পহেলা বৈশাখকে উপলক্ষ করে এখন যে চাঞ্চল্য ও আনন্দ উৎসব দেখা যায়, তা নিতান্তই মেকি একথা বলা যাবে না, কিন্তু এর মধ্যে মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত নাগরিকদের বুর্জোয়া বিলাস ও ফ্যাশনের একটা বড় অংশ কাজ করছে একথা মানতেই হবে। পহেলা বৈশাখকে এ অবস্থা থেকে উদ্ধার করা প্রয়োজন বৃহত্তর জনজীবনের সঙ্গে, শ্রমজীবি মানুষের সঙ্গে।’

বাংলার নববর্ষ বাঙালিদের ঘরে ঘরে নিয়ে আসে নতুন সুর, নতুন উম্মাদনা। এটি সকলকে নতুন চেতনায় উদ্দীপ্ত করে। তাই আমাদেরকেও সকল ধরনের ভ্রান্ত ধারণা মুছে, বাংলার এই ঐতিহ্যকে নিজের মধ্যে ধারণ করতে হবে।

Print Friendly and PDF

সর্বাধিক পঠিত
  • ইংরেজির বড়াই

    ‘আগে চাই বাংলা ভাষার গাঁথুনি, তারপর ইংরেজি ভাষার পত্তন’ বলেছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। প্রত্যেক দেশের মানুষেরেই একটি নির্দিষ্ট ভাষা রয়েছে, নির্দিষ্ট সংস্কৃতি রয়েছে। তবে আজ আমরা অনেকেই আমাদের ভাষা, সংস্কৃতিকে ভুলতে বসেছি। বর্তমানে নিজ দেশের সংস্কৃতি ও ভাষার তুলনায় আমরা অন্য দেশের ভাষা ও সংস্কৃতি মেনে চলতে বেশি ভালোবাসি, স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি!

  • মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্সে নাই যুদ্ধ সরঞ্জাম (ভিডিওসহ)

    চার বছর আগে টাঙ্গাইলে যুদ্ধের স্মৃতি সংরক্ষণ করতে মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স তৈরি করা হলেও সেখানে এখনও ঠাই পায়নি কোনো স্মৃতি বা যুদ্ধ সরঞ্জাম।

  • ফুটবল নিয়ে কুরুক্ষেত্র 

    খেলা বিনোদনের সেরা মাধ্যম। আমরা চার বছর অন্তর অন্তর ফিফার বিশ্বকাপ ফুটবল খেলা দেখার জন্য অপেক্ষায় থাকি।