আমার কথা

নানজীবা খান (১৭), ঢাকা

Published: 2018-04-02 20:33:07.0 BdST Updated: 2018-04-05 18:46:14.0 BdST

আমার ভাইয়ের বয়স যখন এক কি দুই বছর তখন পর্যন্ত ও অন্য স্বাভাবিক শিশুর মতো মা, বাবা, চাচা, আপু বলত।

আমিও তো তখন ছোট ছিলাম। ও আমার সাথে খেলত। খেলনা নিয়ে আমাদের প্রায়ই মারামারি লাগত। ও যে আজ পর্যন্ত আমার কত পুতুলের মাথা, হাত, পা ভেঙেছে সে হিসাব করতে নিঃসন্দেহে অনেক সময় লাগবে। তবে আমরা বেশি মারামারি করতাম চকলেট নিয়ে। কারণ মা প্রতিদিন অফিস থেকে এসে আমার হাতে চকলেট দিতেন। ও আসার পর সেখানে ভাগ বসল। মাঝে মাঝে ভাগ তো দূরে থাক আমার নিজের ভাগেও কিছু থাকত না। ও নিজেরটা তো খেতই সেই সাথে আমার হাতের চকলেট দেখলে সেটাও খাওয়ার জন্য কান্নাকাটি করত। আমার মাও যেন কেমন ছিল। ছেলে হওয়ার পর যেন তার আর মেয়ের দিকে চোখই পড়ে না।

আব্বু ঠিকই আমার জন্য চকলেট এনে সরিয়ে রাখতেন। সবই ঠিক ছিল। এভাবে হাসিকান্নায় চলছিল আমাদের জীবন। তবে বাদ সাধল একটা বিপত্তি। দুই বছর পর্যন্ত সবই ঠিক ছিল। জীম মানে আমার ভাই রাস্তা দিয়ে গরু যেতে দেখলেই ‘গরু’ বলে ডাকত। ছড়ার বইয়ে পশু-পাখি, ফল এসবের নাম বলতে পারত। হাঁটতে যখন শিখেছে তারপর থেকে ওকে আর বিছানায়ই পাওয়া যেত না! সারাদিন এক ঘর থেকে আরেক ঘরে যেত। বল নিয়ে খেলতে খুব পছন্দ করত। তবে সুযোগ পেলেই আমার দিকে বল ছুঁড়ে মারত। আমার সঙ্গে খুনসুটিতে ওর খুব আনন্দ হতো।

জীম যখন দুই বছর পার করল, ওর ভেতরে এক অস্বাভাবিক পরিবর্তন আমরা খেয়াল করলাম। ও আগের মতো পাখি দেখলে পাখি বলত না, ওর হাত থেকে চকলেট কেড়ে নিলেও ও কাঁদত না। বরং তার কোনো খেয়ালই থাকত না যে কখন ওর হাত থেকে আমি ওর চকলেট কেড়ে নিয়েছি।

আগে জীম মাকে না দেখলে মা বলে ডাকত। ও রান্না ঘরে ঢুকে ছুরি ধরত বলে মা দরজা বন্ধ করে রান্না করতেন। একদিন মা খেয়াল করলেন জীম শুধু দরজা ধাক্কাচ্ছে তবে একবারও মা বলে ডাকছে না।

তখন ওর বয়স আড়াই বছর। সেই রাতেই ওষুধ খাওয়ানোর সময় ও খিঁচুনি দিয়ে নিস্তেজ হয়ে গেল। সেই ভয়াবহ দিনের কথা আমার আজও মনে আছে। ওর পুরো ঠোঁট নীল হয়ে গিয়েছিল। সাথে সাথেই আব্বু আম্মু ওকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলেন। ডাক্তার কিছু টেস্ট করাতে দিলেন। টেস্টে ধরা পড়ল ও অটিস্টিক।

ও যখন হয়েছিল তখন রিপোর্ট স্বাভাবিক ছিল। তবে জন্মের পরের দিন মায়ের একটা হাত জিমের গায়ে লাগার সাথে সাথেই ও মাকে কনুই দিয়ে ধাক্কা দিয়েছিল। তখন সেখানে থাকা চিকিৎসকরা বলেছিলেন, ‘কী সেন্সিটিভ বাচ্চা!' কিন্তু এরপরে তারা আর কিছুই বলেননি।

জীমের যখন অটিজম ধরা পড়ল আমি খেয়াল করতাম আমার মা-বাবা আর আগের মত হাসতেন না। আমার সাথে আগের মতো সময়ও দিতেন না, গল্পও না। সব কিছু কেমন যেন পাল্টে গেল। আমার এখনও মনে আছে জীম ঘুমিয়ে যাওয়ার পরে আম্মু ওর মাথায় হাত বুলাতেন আর কাঁদতেন। আব্বুও অনেক বিষণ্ণ থাকতেন। অফিস থেকে আসার পরে তারা দুই জনই জীমের সাথে থাকতেন।

তবে আমরা পারিবারিক সহযোগিতা অনেক পেয়েছি। আমার খালা, চাচারা প্রায়ই জীমকে দেখতে আসতেন। তবে প্রথম দিকে আম্মু জীমকে কোথাও নিতে চাইতেন না। কারণ ও যেখানেই যেতো, খুব চিল্লাচিল্লি, জিনিসপত্র ভাঙচুর করত। কাউকে বসতে দিত না, খেতে দিত না। সারাদিন হৈ চৈ করত। তাই আমরা ওকে ঘরের বাইরে নিতাম না।

একদিন আম্মু অফিস থেকে এসে আব্বুকে বললেন, জীমকে আবার ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে। ডাক্তার সব দেখে বললেন, কোনো সমস্যা নেই যদি জীমকে ঠিকমতো পরিচর্যা করা হয়, ও সবার মতো চলতে পারবে। সাথে এটিও বললেন যে অটিজম কোনো রোগ না। আর ওষুধ দিয়ে অটিজম সারানো সম্ভব না। ওর জন্য দরকার সময়।

কিন্তু আমার মা-বাবা দুইজনই সরকারি চাকরিজীবী। প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত তারা অফিসই করেন। এভাবে জীমকে সময় দেওয়া তাদের পক্ষে অসম্ভব। চিকিৎসক ওকে স্কুলে দেওয়ার পরামর্শ দিলেন।

জীম ঘরেই এক মুহূর্তের জন্য বসে না, ও স্কুলে গিয়ে ক্লাস করবে এটা তখন আমরা সবাই অসম্ভব মনে করেছিলাম। আর তখন সে অনেক উত্তেজিত থাকতো। কারও কথা বুঝতো না। কি চাচ্ছে সেটাও বোঝাতে পারত না। আর যেটা চাচ্ছে সেটা দিতে না পারলে ও রেগে যেতো।  টানা তিন চার মাস আম্মু-আব্বু অফিস, খাওয়া, বিশ্রাম সব বাদ দিয়ে সারাদিন রাত জীমকে নিয়ে ঘুরলেন। স্কুলে দেওয়ার চেষ্টা করলেন। তবে জীম কিছুতেই গেল না।

কার্টুন চ্যানেল ছাড়া আমাদের বাসায় টিভিতে অন্য কিছু দেখা প্রায় অসম্ভব ছিল। একবার চ্যানেল পরিবর্তন করলেই ও কান্নাকাটি শুরু করত। বাসায় লম্বা একটা টেবিলের উপরে টিভি ছিল। ওর যখন পাঁচ বছর তখন ও টেবিলে উঠতে পারত। 

একদিন মা জীমকে রেখে এক মিনিটের জন্য রান্না ঘরে গিয়েছিলেন। মাত্র কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে ও টিভি ফেলে দিল। টিভি ভেঙ্গে পুরো ঘর কাঁচে ভরে গিয়েছিল। তবে একটা কথা না লিখলেই নয় টিভি ভাঙার পর তার সেই দুষ্ট আর হাসিমাখা মুখ আমার এখন মনে গেঁথে গিয়েছে। এরকম আরও অনেক জিনিস সুযোগ পেলেই ভাঙত ও।

বেশি নষ্ট করত আমার রঙ। পেলেই মেঝেতে ঘসে সব শেষ করত। আর আমাদের বাড়ির দেয়াল দেখলে মনে হবে আমাদের খুব রঙ প্রিয়। কারণ, জীম সারা দেয়ালে সুযোগ পেলেই কলম, পেন্সিল, রঙ দিয়ে আলপনা আঁকতে গিয়ে রাস্তার জেবরা ক্রসিং এর মত শুধু দাগ দিত।

তবে আমরা জীমকে গ্রামে নিতাম না। কারণ, গ্রামের মানুষকে কিছুতেই ‘অটিজম’ বিষয়টা বোঝানো যেত না। ওরা জীমকে দেখলেই ‘পাগল’ বলে ডাকত আর হাসত। তখন আমার ভীষণ খারাপ লাগত।

আজ জীমের বয়স ১৪ বছর। ও কুড়িলের একটি প্রতিবন্ধী স্কুলে পড়ে। প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে দুপুর পাঁচটা পর্যন্ত জীম ওর মতো আরও অনেক শিশু সাথে ক্লাস করে।

অথচ এই জীমকেই ক্লুলে ভর্তি করার কথা আমরা কল্পনাও করতে পারতাম না। তবে জীমের আজকের উন্নতি একদিনে হয়নি। দুই থেকে তিন বছর ওকে নিয়ে ঘুরতে হয়েছে নানা জায়াগায়। একজন অটিজম শিশুকে নিয়ে করা লড়াই শুধু তার পরিবার জানে।

ওর জন্য দুই থেকে তিনটি প্রতিবন্ধীদের স্কুল এবং সাত-আটবার বাসাও পরিবর্তন করতে হয়েছে।

জীম আগে অনেক উত্তেজিত থাকত। এখন আগের থেকে অনেক কমে গিয়েছে। কারণ আম্মু এখন ওকে মিষ্টি, গম জাতীয় খাদ্য খেতে দেয় না। এখন আমরা সকালে আটার রুটির বদলে চালের রুটি খাই, চিনি লুকিয়ে রাখি। কারণ, এই জাতীয় খাদ্য জীমের মত শিশুদের উত্তেজনা বাড়ায়।

আগে ও লজ্জা বুঝতো না। এখন সবসময় জামা পরে থাকে। নিজে গোসলের কাজ শেষ করে নিজের কাপড় ধুয়ে বারান্দায় দেয়। নিজের হাত দিয়ে খায়। আগে খেতে পারতো না কারণ আঙুল নাড়াতে ওর সমস্যা হতো। সব কিছুই ধরতে পারত কিন্তু কিভাবে ধরতে হবে সেটা বুঝতো না। নিয়মিত হাতের ব্যায়াম করার ফলে সে এখন সাবান দিয়ে ভালো মতো হাত ধুতে পারে। আগে পা উঁচু করে হাঁটতো। এখন সেটা অনেকটাই কমেছে। এমন না যে তার পায়ে সমস্যা। কিন্তু আগে এরকম ভাবে হাঁটতে কেনো জানি ওর ভালো লাগতো।

স্কুল থেকে বলে দিয়েছিলো যে যখনই পা উঁচু করে হাঁটবে তখন তাকে বলতে হবে মাটিতে ভালো মতো পা রেখে হাঁটতে।

এসব শিশুদের অনেকেই নির্দিষ্ট কোনো একটি বিষয়ে খুব মেধাবী হয়। জীম কোন বিষয়ে ভালো সেটি এখনও আমরা খুঁজে বের করতে পারিনি। স্কুলের সবাই বলে জীম অন্য বাচ্চাদের থেকে দ্রুত কোনো বিষয় ধরতে পারে এবং সেই অনুযায়ি কাজ করতে পারে। তবে জীমের শিক্ষকদের ধারণা সে কম্পিউটার বিষয়ে ভালো। আমারও তাই মনে হয়। আমি শুধু একদিন দেখিয়ে দিয়েছি গুগলে গিয়ে ইউটিউব কিভাবে বের করতে হয়, পরের দিন ও নিজেই বের করে মুভি দেখেছে। এটা দেখে আমি তো অবাক হয়েছিলাম। যদিও এক কম্পিউটার নিয়ে প্রতিদিন জীম আর আমি মারামারি করি তাও জীমের এই মেধা দেখে আমার খুব খুশি লাগে।

তবে একটি বিষয় প্রায় সময়ই আমাদের ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। মাঝে মাঝে মনে হয় জীমকে আর্মিদের কাছে পাঠিয়ে দেই। কারণ ও খুবই সুশৃঙ্খল। এলোমেলো কিছু একদম সহ্য করতে পারে না। পুরনো রুটিন মাফিক কাজ ওর পছন্দ। তবে এটা একটি সমস্যা যে ওর নতুন জিনিস মেনে নিতে অনেক কষ্ট হয়। এমনকি আমরা যখন বাসা বদলাই, সেই রাতটা ও কিছুতেই ঘুমায় না। আগের বাসায়ই ফিরে যেতে চায়। নতুন কোনো কিছুই তার পছন্দ না। আগে জীম মানুষের সাথে মিশতে চাইত না। বাসায় কেউ এলেই বের করে দিত।

তবে এখন জীম মানুষকে পছন্দ করে। এক্ষেত্রে অবশ্য আমার ক্রেডিট দিলে ভুল হবে না। কারণ আমার টিভি প্রোগ্রামের অর্ধেক টাকার বেশি অংশই আমরা দুই ভাই বোন মিলে রেস্টুরেন্টে আর বাইরে ঘুরে কাটাই। ওকে বাইরের পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে আমি এই কাজটা নিয়মিত করি।

আগে আমার একটু কষ্ট লাগত যখন দেখতাম আমার বান্ধবীর ভাইদের। তবে এখন আমার খুব ভাল লাগে। কারণ, আজ যদি জীম না থাকত তবে আমি পথশিশুদের এত আপন করে নিতে পারতাম না, হয়ত বা পারতাম না শিশুদের নিয়ে কাজ করতে। যখন আমার মনে হয় আমি এই কাজটা করতে পারব না তখন শুধু চোখ বন্ধ করে জিমের কথা চিন্তা করি। যখনই ওর হাসিমাখা মুখটা ভেসে উঠে আমি আর তখন পিছপা হতে পারি না। আজ ও আছে বলেই হয়তো টাকা পেলেই আনন্দ হয় এটা ভেবে যে, আজ জীমকে নিয়ে বাসার পাশের মীনা বাজারে গিয়ে চকলেট কিনতে পারব। আগে কাঁদতাম, জীম আমার হাতের থেকে চকলেট কেড়ে নিত বলে, এখন অপেক্ষায় থাকি কখন ও আমার হাত থেকে চকলেট কেড়ে খাবে!

হয়ত জীম আমার লেখা দেখে বুঝবে না যে এটা শুধুমাত্র ওর জন্যই লেখা। তবে খুব খুশি লাগছে এটা ভেবে যে, আমি ওকে নিয়ে লিখতে পারছি। কিন্তু আমি অনেক খুশি জীমকে পেয়ে। তবে আমি আশাবাদী, জীম একদিন অটিজমকে জয় করবেই।

Print Friendly and PDF

সর্বাধিক পঠিত
  • আমার ভালোবাসা

    মানুষের জীবনে নিজের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জিনিস হলো তার নাম। নাম দিয়েই আমরা একজন থেকে আরেকজনকে আলাদা করে চিনতে পারি। আর নিজের নাম ভালোবাসে না বা অন্যের মুখে সে নাম শুনলে ভালো লাগে না এমনটি হতে পারে খুব কম।

  • বগুড়ায় এডওয়ার্ড পার্ক শিশুদের প্রিয় জায়গা (ভিডিওসহ)  

    শিশু-কিশোরসহ বড়রাও বেড়াতে ভালোবাসেন বগুড়া এডওয়ার্ড পার্কে।

  • একাধিক শিশু জন্মানোর ঝুঁকি ও সতর্কতা (ভিডিওসহ)

    প্রায়ই আমরা জমজশিশু জন্মাতে দেখি। কখনো কখনো দুইয়ের বেশি শিশু প্রসব করার ঘটনাও শোনা যায়। সম্প্রতি টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে কুমুদিনী হাসপাতালে পরপর তিন নবজাতকের জন্ম দেন বানাইল গ্রামের সুবর্ণা বেগম।