অন্য চোখে

আমিনুর রহমান হৃদয় (১৭), ঠাকুরগাঁও

Published: 2017-07-25 21:52:11.0 BdST Updated: 2017-07-25 21:58:44.0 BdST

শুধু কলম সৈনিক নন, জীবনের জন্য, দেশের জন্য বেবী মওদুদ লড়াই করেছে আমৃত্যু। তিন বছর আগে ২৫ জুলাই না ফেরার দেশে চলে যান তিনি। ক্যান্সারে ভুগে ৬৬ বছর বয়সে মারা যান এই লড়াকু সাংবাদিক।

বেবী মওদুদের নাম শুনেছি অনেক। তবে সাংবাদিকতা ছাড়াও তিনি লেখক, নারী অধিকার আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক ও সাংসদ ছিলেন। সংরক্ষিত নারী আসনের একজন সংসদ সদস্য থাকার সময়ও তিনি নিজেকে সাংবাদিক বলেই পরিচয় দিতেন। সাংবাদিকতা ছিল তার পেশা ও নেশা।

কলকাতায় ১৯৪৮ সালের ২৩ জুন জন্ম নেন তিনি। বাবা আবদুল মওদুদ ছিলেন বিচারপতি। মায়ের নাম ছিল হেদায়েতুন নেসা। ছয় ভাই ও তিন বোনের মধ্যে বেবী মওদুদ ছিলেন তৃতীয়। জন্মের সময় আকিকা দিয়ে তার নাম রাখা হয় আফরোজা নাহার মাহফুজা খাতুন।

ঘামাচির আক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য অনেক মা-ই শিশুদের গায়ে ট্যালকম পাউডার মাখিয়ে থাকেন। বেবীর মওদুদের মাও ব্যতিক্রম ছিলেন না। তিনি মাখাতেন বেবী জনসন পাউডার। ছোট্ট বোনটির সারা গায়ে বেবী জনসন পাউডার দেখে বড় ভাই তাকে বেবী বলে ডাকা শুরু করেন।

এত বড় নাম ভালো লাগত না বলে বড় হয়ে লেখালেখি করতে এসে তিনি নিজেই নিজের নাম বেবী মওদুদ রাখেন। সেই থেকেই তিনি বেবী মওদুদ নামে পরিচিত। একান্ত প্রয়োজন না হলে তিনি নিজের আকিকার সময়ে রাখা নামটি ব্যবহার করতেন না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ষাটের দশকের ছাত্রী ছিলেন। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের আগে ছাত্র রাজনীতিতে সক্রিয় অংশ নিয়েছেন। ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের সময়ে বেবী মওদুদ পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের সদস্য এবং ১৯৭১ সালের অসহযোগ আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের সময় ঢাকায় বেগম সুফিয়া কামালের সঙ্গে কাজ করেন।

বাংলায় স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের আগে ১৯৬৪ থেকে ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র পরিষদের আহ্বায়কের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬৭-৬৮ মেয়াদে তিনি ছিলেন রোকেয়া হল ছাত্রী সংসদের সাহিত্য সম্পাদক। ১৯৯১ সাল থেকে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির আন্দোলনেও সক্রিয় ছিলেন তিনি। সে সময় তাকে পুলিশের লাঠিপেটার শিকার হতে হয়েছিল।

মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ তৈরি করার ক্ষেত্রে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার যাবতীয় আন্দোলনে বেবি মওদুদ ছিলেন ঘনিষ্ঠ সহযোগী।

তিনি ১৯৬৭ সাল থেকে সাংবাদিকতায় যুক্ত হয়ে দৈনিক সংবাদ, বিবিসি, দৈনিক ইত্তেফাক, বাসস ও সাপ্তাহিক বিচিত্রায় দীর্ঘদিন কাজ করার পর ২০০৯ সালে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমে যোগ দেন।

সাংবাদিকতার পাশাপাশি শিশু-কিশোরদের জন্য বিভিন্ন বিষয়ে নিয়মিত লেখালেখি করতেন। তার শিশুতোষ বইয়ের মধ্যে রয়েছে দীপ্তর জন্য ভালবাসা, টুনুর হারিয়ে যাওয়া, শান্তর আনন্দ, এক যে ছিল আনু, মুক্তিযোদ্ধা মানিক, আবু আর বাবু এবং কিশোর সাহিত্য সমগ্র। এছাড়াও শেখ মুজিবেরর ছেলেবেলা, মনে মনে (ছোট গল্প), দুঃখ-কষ্ট-ভালবাসা (উপন্যাস), সুষি পুষি টুষি (ছড়া) ও পাকিস্তানে বাংলাদেশের নারী পাচার তার উল্লেখযোগ্য প্রকাশনা।  

আমাদের দেশের একজন সাহসী কলম সৈনিক ছিলেন তিনি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ সম্পাদনাতেও তার ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। বেবী মওদুদ ছোটবেলা থেকেই লেখালেখি করতেন, ভালোবাসতেন বই পড়তে, শখ ছিল গান শোনা আর নানা জায়গায় ঘুরে বেড়ানো।

ব্যক্তিগত জীবনে স্বাধীনতার পরপরই ১৯৭২ সালে ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ উপজেলার সাংবাদিক হাসান আলীর সাথে বেবী মওদুদের বিয়ে হয়। হাসান আলী দৈনিক সংবাদের রিপোর্টার ছিলেন। পরবর্তীতে হাসান আলী মুখ্য রিপোর্টার, নগর সম্পাদক ও বার্তা সম্পাদক হয়েছিলেন এবং তিনি বাংলাদেশের একটি সাম্যবাদী দলের সদস্য ছিলেন। ১৯৭৫ সালে চারটি বাদে সব পত্রিকা বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে সাংবাদিকতা ছেড়ে দিয়ে আইন পেশায় মনোনিবেশ করেন তিনি।  

১৯৮৫ সালের এপ্রিল মাসে স্বামী মো. হাসান আলীর মৃত্যু হয়। পরবর্তীতে বেবী মওদুদ নিজেই তার দুই পুত্র রবিউল হাসান অভী ও শফিউল হাসান দীপ্তর দায়িত্ব নেন এবং নতুন করে জীবন-সংগ্রাম শুরু করেন। কিন্তু নীতি ও আদর্শ থেকে তিনি কখনও বিচ্যুত হননি। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের সোশ্যাল অ্যাফেয়ার্স এডিটর ছিলেন।

হ্যালোর সাথেও সম্পৃক্ত ছিলেন বেবী মওদুদ। তৃতীয় মৃত্যুবার্ষিকীতে হ্যালোর পক্ষ থেকে তার প্রতি রইল আমার প্রাণঢালা শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।

Print Friendly and PDF

সর্বাধিক পঠিত