অন্য চোখে

সাদিক ইভান (১৫), ঢাকা

Published: 2017-03-07 18:38:37.0 BdST

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এখন ছাত্র ও ছাত্রীর সংখ্যা প্রায় সমান। কর্মক্ষেত্রেও পিছিয়ে নেই নারী। আইন শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী কিংবা সাংবাদিকতার মতো চ্যালেঞ্জিং পেশাতেও নারীরা দক্ষতার ছাপ রেখে যাচ্ছেন।

আমাদের দেশে রাষ্ট্র পরিচালনাসহ রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ একটা অংশ দখল করে আছে নারী। উন্নত বিশ্বে রাজনৈতিক নেতৃত্ব দেওয়ার দৃষ্টান্ত রয়েছে বাঙালি মেয়েদেরও।

ছেলেদের চেয়ে কোনো অংশেই পিছিয়ে নেই তারা। তবুও নানা জায়গায় মেয়েদের হেয় করা হয়। শুধুমাত্র মেয়ে বলে সুযোগ পায় না অনেক জায়গাতেই।

এমনকি পাঠ্যবইয়ে করা হয়েছে নারী-পুরুষের অসম উপস্থাপন। নারীকে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে আবেগ, দুর্বল আর সহিষ্ণুতার প্রতীক হিসেবে। যেখানে পুরুষকে চঞ্চল, পরিশ্রমী, সৃজনশীল আর সর্বেসর্বা হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।

বিগত সাত বছরের ধারাবাহিকতায় বছরের প্রথম দিনে সরকার বই উৎসব পালন করছে। এবারও বছরটি বই উৎসব দিয়ে শুরু হলেও এর সঙ্গী হয়েছে নানান বিতর্ক।

২০১৭ সালের পাঠ্যবইয়ে আমূল পরিবর্তন আনা হয়েছে। বিভিন্ন বইয়ের অনেক জায়গায় নারীকে উপস্থাপন করা হয়েছে দুর্বল করে। 

প্রথম শ্রেণির বাংলা বইয়ের ১৬ পৃষ্ঠায় ‘ও’ অক্ষর চেনার ছবি হিসেবে ‘ওড়না’ প্রশ্নে বিতর্ক উঠেছে। এটা নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে নিন্দাও জানিয়েছেন অনেকে। এটাকে সাম্প্রদায়িক ভাবনা বলেও অনেকে আঙুল তুলেছেন।

নারীর অগ্রগামিতা, দেশ পরিচালনা, বিশ্ব নেতৃত্ব দেওয়ার মতো ঘটনাগুলো আড়ালে রয়ে গেছে।

কয়েক জায়গাতে নারীকে তুলে ধরা হয়েছে শুধু ঘরোয়া কাজের অংশগ্রহণকারী হিসেবে।

অধ্যক্ষ মো. জয়নাল আবেদীনের লেখা এনসিটিবি’র তৃতীয় শ্রেণির বাংলা ব্যাকরণ বইতে বহুবচনের উদাহরণ আছে, 'মায়েরা বড় দুর্বল'। একই বইয়ে মাতা-পিতার প্রতি দায়িত্ব কর্তব্য বিষয়ক একটি রচনা রয়েছে। যেখানে লেখা হয়েছে ‘মা দিনরাত সন্তানের সেবা যত্ন করেন, আর বাবা জোগান দেন সন্তান বেঁচে থাকার খাবার, ওষুধ ও কাপড়। বাবার পরিচয়ে সন্তান গড়ে উঠে’।

তাহলে দেশের কর্মজীবী নারীরা উপার্জিত টাকা কী করেন? সন্তানের স্কুলের বেতন, পোশাক বা খাবার কি মায়ের টাকায় কেনা হয় না?

এমন কোনো অফিস-আদালত খুঁজে পাওয়া যাবে না, যেখানে নারীরা কাজ করছেন না। শিশুরা এখন মাকে নিয়মিত দেখছে অফিস যেতে। প্রণেতারা কী একবারও ভেবে দেখেছেন, বাচ্চাদের কাছে এই পড়াগুলো মনের অজান্তেই মার ভাবমূর্তিকে অবমূল্যায়ন করতে শেখাবে।

শুধু অফিস আদালতে নয়, মেয়েরা অবদান রাখছেন খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও। কিছুদিন আগেই বাংলাদেশের জন্য বিদেশের মাটি থেকে এএফসি অনূর্ধ্ব-১৪ আঞ্চলিক চ্যাম্পিয়নশিপ (দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া) শিরোপা জিতে এনেছে ময়নসিংহের কল সিন্দুরের কিশোরীরা।

পঞ্চম শ্রেণির বাংলাদেশ ও বিশ্ব পরিচয় বইয়ে ‘বাংলাদেশের শিল্প’ নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। কিন্তু অবাক করা বিষয় হচ্ছে ঐখানে পাট শিল্প নিয়ে আলোচনা রয়েছে কিন্তু নারীদের দেখানো হয়নি। নারীদের ফুটিয়ে তোলা হয়েছে শুধু পোষাক শিল্পের আলোচনায়। আপনিও হয়তো একমত হতে পারেন যে, নারীরা শুধু গার্মেন্টেস কারখানাতেই কাজ করেন। তাই বইয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। তবে খোঁজ নিলেই জানা যাবে পাটশিল্পে নারীর অংশগ্রহণ কতখানি। বীজ বপন থেকে শুরু করে পাটের আঁশ ছাড়ানো, শুকানোতে কাজ করেন নারীরাও। 

শিশুদের কাছে নারীকে এভাবে উপস্থাপন করাটা আমার কাছে অসম্মানজনক মনে হয়েছে। দেশটির ভবিষ্যৎ নিয়ে বড্ড সংশয় হয় এখন। কেন না ছোটকালের শিক্ষা মানব জীবনে সবচেয়ে বেশি প্রভাব বিস্তারী। আর সেখানে যদি বৈষম্য শিখে আসে তাহলে সে শিক্ষা কতটা ভয়ানক হতে পারে তা ভেবে গা শিউরে উঠছে।

মাধ্যমিকের বইগুলো ঘেঁটেও খুব একটা খুশি হওয়ার যায় না।

মাধ্যমিকের শারীরিক শিক্ষা বইয়ে কঠিন ব্যায়ামগুলোতে ছেলের ছবি আর সাধারণ ও সহজ ব্যায়ামে নারীর ছবি ব্যবহার করা হয়েছে।

বিজ্ঞান বইয়ে নারীকে আবিষ্কার করা তো এক কঠিন ব্যাপার। পাঠ্যবইগুলো বোধ হয় বলতে চায় গবেষণা-আবিষ্কারে নারীরা খুব একটা বিশ্বাস করেন না। কৃষি শিক্ষা বইয়ে তুলে ধরা হয়েছে মাঠের কাজ ছেলেদের আর মুরগি পালন মেয়েদের কাজ। পঞ্চম শ্রেণির ইংরেজি বইয়ের ৫১ পৃষ্ঠাতেও মাঠে ধানের কাজে শুধু পুরুষদেরই দেখানো হয়েছে। অথচ ধানের জমিগুলোতে ধান বোনা থেকে শুরু করে ফসল ঘরে তোলা পর্যন্ত সব কাজেই নারীর অংশীদারিত্ব রয়েছে।

সভ্যতার বিবর্তনে কৃষির সাথে নারীর সংযুক্তি কমেনি বরং বেড়েছে। বাংলাদেশ শিক্ষা, তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) ২০১৪ প্রতিবেদন অনুযায়ী দেশে চারটি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৪০ শতাংশ ছাত্রী। ২০০৯ সালে যা ছিল ৩০ শতাংশ। এই ১০ শতাংশ বেড়ে দাঁড়ায় মাত্র পাঁচ বছরে। তবুও পাঠ্যবইগুলো কী শেখাতে চায়?

এসএসসি প্রোগ্রামের ‘ক্যারিয়ার শিক্ষা’ বইটির ৬৫ পৃষ্ঠায় দেওয়া একটি অযৌক্তিক ব্যাপারও নজরে আসে। কর্মপত্র-১ এ বলা হয়েছে নিচের কার্ড সেট থেকে নারী ও পুরুষের কাজ পৃথক কর। বইয়ে শুধু প্রশ্নটি রয়েছে উত্তর দেওয়া নেই। গাইড বইয়ের উত্তরপত্রে দেখা গেছে সন্তান ধারণ করা, মাছ কোটা, বিয়ে বাড়িতে বিয়ের কাজগুলো নারীর। আর সাঁকো মেরামত করা, বিচার-সালিশ, বিমান চালানো, ভোটে দাঁড়ানো পুরুষের কাজ। অথচ আমাদের দেশে রাজনীতি ও নির্বাচনের বড় একটা অংশই নারীর হাতে।

বর্তমান সমাজে নারী পুরুষের কাজ পৃথক করা নেহাত অজ্ঞতা। লক্ষ্য করে দেখবেন, যে কাজগুলোর উল্লেখ আছে সব গুলোই বাংলাদেশের নারী ও পুরুষ উভয়েই করছেন।

মাধ্যমিক থেকে যে গার্থস্থ্য বিজ্ঞান বইটি পাওয়া যায় সেটি বোধ হয় কড়া নির্দেশ দিয়ে যাচ্ছে যে ঘরের কাজ শুধুই নারীদের। এই ধরণের চিত্র শুধু মাধ্যমিকের গার্হস্থ্যে নয় প্রাথমিকের বইতেও রয়েছে।

কিন্তু গৃহস্থালীর কাজ তো উভয়েরই করা উচিত এবং তা করেনও। কিন্তু পাঠ্যবইয়ে একদমই বিপরীত শিক্ষা রয়েছে। বর্তমান প্রেক্ষাপটের সাথে যায় না এমন বিষয় তুলে ধরে শিশু-কিশোরদের কাছে পড়াশোনাকে অনেকাংশে অবাস্তব করে তোলা হচ্ছে।

নারীকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য পাঠ্যবইয়ে ইচ্ছামত লেখা কিংবা অবাস্তব ছবি ছাপানোর পক্ষেও আমি নই। বাংলাদেশের পারিবারিক, সামাজিক এবং রাষ্ট্রের বর্তমান চিত্র তুলে ধরার মধ্যেই রয়েছে এর সুরাহা। সময় এসেছে ভেবে দেখার ।

Print Friendly and PDF
সর্বাধিক পঠিত