খবরাখবর

সাদিক ইভান (১৬), ঢাকা

Published: 2017-07-06 20:19:59.0 BdST

প্রশাসনকে ফোন করে নিজের বাল্য বিয়ে বন্ধ করা বিথী আক্তার পারিবারিক হীনমন্যতার মধ্যেও স্কুলে যাচ্ছে। হাতের বড় জখম নিয়েও প্রস্তুতি নিচ্ছে অর্ধবার্ষিক পরীক্ষার। ওর জন্য বিশেষ ব্যবস্থাও নিয়েছে প্রশাসন।

টাঙ্গাইলের কালিহাতী উপজেলার এলেঙ্গা ইউনিয়নের মহেশপুর গ্রামের মেয়ে ও।

অমতে এক বাস চালকের সঙ্গে পরিবার বিয়ে ঠিক করায় নবম শ্রেণির ছাত্রী বিথী আক্তার নিরুপায় হয়েই ফোন করে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে (ইউএনও)।

কালিহাতী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবু নাসারউদ্দিনের সঙ্গে কথা হয় হ্যালো'র।

তিনি বলেন, "গত সপ্তাহে বিথী আক্তার নামের ১৪/১৫ বছরের ওই কিশোরী আমাকে ফোন করে আস্তে আস্তে বলছিল আপনি কি বাল্যবিয়ে ঠেকাতে পারবেন? আমি বললাম, ‘পারবো না কেন?’ নাম ঠিকানা বিস্তারিত জানাও আমি দেখছি। এরপর মেয়েটি জানায় যেভাবেই হোক বিয়ে ভাঙতে হবে। জুনের ২৯ তারিখ বৃহস্পতিবারেই বিয়ের আয়োজন।”

ঠিক সেদিনই বিথীর বাড়িতে উপজেলার বেশ কয়েকজন কর্মকর্তাকে সঙ্গে নিয়ে হাজির হন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবু নাসারউদ্দিন। খানিক বাদেই ওই অভিযানে যুক্ত হয় পুলিশ।

বিথীর বাবা বেল্লালকে বাল্যবিয়ে বন্ধ করতে বলা হয়। তখন তিনি এক নাটকীয়তার অবতারণা করেন বলে জানান আবু নাসারউদ্দিন।

"মেয়েকে ডেকে আনতে বললে বেল্লাল এমন এক মেয়েকে এনে বসালেন, যাকে দেখেই বুঝা যাচ্ছিল মেয়েটার বয়স একটু বেশি। বিভ্রান্তিতে পড়ে যাই, মনকেও বিশ্বাস করাতে পারছিলাম না যে, এই মেয়েটি ফোন করেছিল" হ্যালোকে বলছিলেন আবু নাসারউদ্দিন।

সন্দেহ হলে ওই মেয়েটিকে এবং উপস্থিত আত্মীয়স্বজনদের আলাদা আলাদা করে জেরা করেন ওই কর্মকর্তা। কিন্তু উভয়ের দেওয়া তথ্য উভয়ের সঙ্গেই মিলে যাচ্ছিল।

আবু নাসারউদ্দিন বলেন, "অনেক চেষ্টা করেও তথ্য পাচ্ছিলাম না। এক পর্যায়ে আন্দাজে একটা প্রশ্ন ছুড়ে দেই। বললাম, “মেয়ের পরিবর্তে নিজের বোনকে বসিয়ে রাখলেন? বোনকে মেয়ে বানিয়ে ফেললেন বেল্লাল? আমি একটু নেতিবাচক ভাবে বললাম তার প্রতিক্রিয়া নিরুপণের জন্য। এরপর বেল্লাল ফিক করে একটু হেসে দেন। তবুও তিনি কিছু বলেননি। মেয়েটার সঙ্গে বেল্লালের চেহারা মিল থাকায় আমি এই প্রশ্নটা করি।”

অবশেষে প্রতিবেশী ও স্থানীয় এক মান্য ব্যক্তির সহায়তায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবু নাসারউদ্দিন জানতে পারেন বিথীকে লুকিয়ে রাখা হয়েছে। এরপর তাকে উদ্ধারও করা হয়।

তিনি বলেন, “আমি তাদের বলেছি মেয়ে প্রাপ্তবয়স্ক হলে বিয়ের সব খরচ আমি দেখব, পড়াশোনার খরচও যথাসাধ্য দেওয়ার চেষ্টা করব। তবুও আপনারা বিয়েটা বন্ধ করেন।”

প্রাপ্তবয়স্ক না হওয়া পর্যন্ত মেয়ের দিবেন না বলেও মুচলেকা নেওয়া হয় বিথীর বাবার কাছ থেকে।

"এ সময় সবাই বলছিল মেয়ের দ্বায়িত্ব নিলেন তো ঈদের সালামী দেন। আমার পকেটে কয়েকটা নতুন পঞ্চাশ টাকার নোট ছিল, সেগুলো আমি দেই বিথীকে। ছেলের বাড়িতে ফোনে নিষেধ করে আমরা ঘটনাস্থল ত্যাগ করি”, বলছিলেন ওই কর্মকর্তা।

এরপর ঘটনা মোড় নেয় অন্যদিকে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাসহ পুলিশের দল ওই বাড়ি থেকে চলে আসার পর পরিবার তাকে আবারও বিয়ের জন্য চাপ দিতে থাকে।

বাকবিতণ্ডার মধ্যে এক পর্যায়ে বিথীর দিকে বটি ছুঁড়ে মারেন তার মা। প্রত্যক্ষদর্শীদের উদ্ধৃত করে নাসারউদ্দিন বলেন, "বিথী কোনো মতেই রাজি হচ্ছিল না। সে বলছিল, স্যার আমাকে পড়তে বলেছেন। আমি পড়ব, বিয়ে করব না। এরপর বিথী বটিটি নিয়ে বলে আমি নিজেকে শেষ করে দিচ্ছি। বলেই সে তার বাম হাতে কোপ মারে।”

কোপ দেওয়াতে বিথীর হাতের তিনটি রগ কেটে যায়। স্থানীয় চিকিৎসকের কাছে নিয়ে সেলাই করা হয়।

তবে এই খবর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবু নাসারউদ্দিন জানতে পারেন ২রা জুলাই রোববার।

"বিথী স্কুলে গেছে কি-না তা জানতে শনিবার ওর স্কুলে প্রধানশিক্ষককে ফোন দিলে তিনি বলেন, ‘বিথী আজ স্কুলে আসেনি।’

“পরের দিনও স্কুলে না যাওয়ায় আমার সন্দেহ হয় মেয়েটার বিয়ে হয়ে গেল কিনা। তাই আমি একজন তথ্য কর্মকর্তাকে ঘটনা জানার জন্য ওই গ্রামে পাঠাই।”

নাসারউদ্দিন বলেন, "এরপর আমি বিথীদের বাড়িতে যাই। চোখের পাশে কাটা দাগ ও হাতে ব্যান্ডেজ দেখতে পাই। কথাবার্তা শেষে বিথীর চিকিৎসার জন্য তিন হাজার টাকাও দিয়ে আসি।”

সাহসী মেয়েটির সার্বিক ঘটনা নিজে তদারকি করছেন জানিয়ে নাসারউদ্দিন বলেন, "বিথী এখন স্কুলে যাচ্ছে। তবে ওর মায়ের মনমানসিকতা বোধহয় পরিবর্তন হয়নি। ওইদিন আচরণে একটু বেশি ক্ষিপ্ত মনে হয়েছিল উনাকে। তবে বিথী আমাকে ফোন দিয়ে জানিয়েছে ৬ জুন তার অর্ধবার্ষিক পরীক্ষা। অংশগ্রহণ করবে কি-না তাও জিজ্ঞেস করেছে। আমি বলেছি তোমার সমস্যা না হলে দাও।”

বিথীর জন্য পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, "বিথীর জন্য একজন শিক্ষকের ব্যবস্থা করেছি যিনি পরীক্ষা চলাকালীন পুরো সময় ওকে সাহায্য করবেন। তবে বিথীকে বলেছি লেখাটা নিজেকেই লিখতে হবে।”

ফোন নম্বর কোথায় পেল এবং মেয়েদের সাহসীকতা নিয়ে ওই কর্মকর্তাকে প্রশ্ন করলে বলেন, "আমি বিভিন্ন স্কু্লে অনুষ্ঠান করে মাদক-বাল্য বিয়ে নিয়ে আলোচনা করে ছেলে মেয়েদের উৎসাহ দেই। সবাইকে আমার ফোন নম্বর দিয়ে আসি এবং বিনা সংকোচে জানাতে বলি।”

বিথীর ঘটনার ঠিক আগের দিন পার্বতী নামে আরেকটি মেয়েও একই কারণে তাকে ফোন করে বলে জানান নাসারউদ্দিন। তিনি বলেন, "হিন্দু বিয়ে তো, তাই পার্বতীর বাবা ৭০ হাজার টাকা বরকে অগ্রিম দেয়। পরিবারটি অনেক গরীব। আমি সেই টাকা ফেরত এনে বিয়ে ভেঙে দেই। এসএসসি পাশ করা পার্বতীকে একাদ্বশ শ্রেণিতে ভর্তিও করালাম।”

Print Friendly and PDF
সর্বাধিক পঠিত