আমার কথা

শাকিল রেজা ইফতি (১৬), ঢাকা

Published: 2017-05-29 19:37:10.0 BdST Updated: 2017-05-29 20:05:49.0 BdST

গান শুনতে শুনতে গণিতের নানান রকম ইকুয়েশন মেলানো আমার বরাবরের অভ্যাস। যে গানটি শুনতাম প্রায়ই, মাও রান্নাঘর থেকে গলা মেলাতেন। ভালো লাগত আমার। কারণ বাড়ি জুড়েই ছিল ভালো লাগার আবহ।

আমাদের বাড়ির নাম ‘কিছুক্ষণ’। নামটা আমার খুব প্রিয়। মায়ের পছন্দে রাখা নাম। সেখানে এখনও সবকিছুই হয়তো তেমনি আছে, শুধু আমি সেখান থেকে অনেক দূরে। 

একাদশ শ্রেণিতে পড়ছি সেন্ট যোসেফ কলেজে। সেই সুবাদে এখন থাকি ঢাকার মোহাম্মদপুর এলাকার একটি হোস্টেলে।   

তবে এখানেও মানিয়ে নিয়েছি নিজেকে। কলেজে ক্লাস শুরু হওয়ার প্রথম দিনটি থেকেই শুনছিলাম ট্যুরের কথা। প্রতি বছরই কলেজ থেকে প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদেরকে নিয়ে যাওয়া হয় ট্যুরে। সাথে থাকেন ডিসিপ্লিনের ব্রাদার ও কয়েকজন শিক্ষক।

সহপাঠীদের মধ্যে যেমন আছে ঠাকুরগাঁও-এর ইমামুন নূর, তেমনই আছে রাঙামাটির এঞ্জেল চাকমা। এই বৈচিত্র্য আমার সব থেকে বেশি প্রিয়। আমরা সবাই সবার সাথে আড্ডা দিই, নিজ এলাকার কথা বলি, রোমন্থন করি অনেক অনেক স্মৃতি।

শুরুতে ভাবতেই পারিনি এই ভিন্ন ভিন্ন অঞ্চলের মানুষগুলো এক হয়ে যাব একদিন। বন্ধুত্বের, মায়ার শেকলে বাঁধা পড়ব। আমরা সবাই হয়ে যাব ‘যোসেফাইট’।

আর যখন শুনলাম এই আমরা সবাই যাব সফরে, অন্যরকম রোমাঞ্চকর অনুভব আমাদের উদ্বেল করে দিল। কলেজ ডিসিপ্লিনের কড়া শাসন, তত্ত্ব কিংবা ব্যবহারিক ক্লাসের চরম ব্যস্ততার মাঝেও যখন একটুখানি আড্ডায় মেতে ওঠার অবসর পেতাম প্রিয় ক্যাম্পাসের ক্যান্টিন, বাস্কেটবল কোর্ট কিংবা মাঠের কোনো এক কোণে- তখন প্রধান বিষয় হিসেবে বারবার সবার আগে আসতো ট্যুরের কথা।

ভালো লেগেছিল খুব সেন্টমার্টিন আর কক্সবাজার ঘুরতে যাব এই ভাবনাতেই।

দেখতে দেখতেই ঘনিয়ে এল ট্যুরের দিন। বহু প্রতীক্ষিত সেই সময়। পুরো কলেজ যেন রঙিন হয়ে উঠল উৎসবের আনন্দে। সোমবার, ৯ জানুয়ারি রাতে আমাদের যাত্রা শুরু হল। সেদিন সকালে খুব করে চেয়েছিলাম কলেজ বন্ধ থাকুক। কিন্তু রাতে যাত্রা শুরু হওয়ার কথা থাকলেও দিনে ক্লাস করতেই হল।

শ্যামলী পরিবহনের সাতটি বাসে একসাথে রওয়ানা হলাম আমরা। প্রথমে টেকনাফ। সেখান থেকে জাহাজে করে সেন্টমার্টিন দ্বীপে। সারা রাতের জার্নি শেষে আমরা সকালে পৌঁছাই টেকনাফে।

জীবনে প্রথম বারের মতো সাগর দেখা। সমুদ্রতীরে বালির বুকে প্রিয় মানুষদের নাম লেখা, অনেক অনেক ছবি তোলা। সাগরের বিশালতা অনুভব করা, সন্ধ্যার পূর্ণিমার আলোতে নীল জল দিগন্তের দিকে দৃষ্টি হারানো, ঢেউয়ের গম্ভীর গর্জনে অনুভব করা নিজের ক্ষুদ্রতা, সবই ছিল কিছুক্ষণের জন্য। সেই আমার মায়ের প্রিয় শব্দটির মতো।     

কে কী করবে, কে কী কিনবে, কে কোন গান শুনবে, কে কোন বীচে স্নান করবে, কার কী পূর্ব অভিজ্ঞতা, কার কী ভয়ের কারণ, এ সবই ছিল আড্ডার বিষয়। আর সমুদ্রের কথা মাথায় আসতেই আপনাআপনি আমার মাথায় বাজত সেই গান, যে গান শুনতাম অংক করতে করতে-আমি মন ভেজাব, ঢেউয়ের মেলায়, তোমার হাতটি ধরে..।

কার হাত? কার হাত?- আড্ডার মাঝে একদিন হঠাৎ বন্ধুদের প্রশ্ন! নিজের অজান্তে কখন গুনগুন করে গেয়ে ফেলেছিলাম, নিজেও জানি না। সবার প্রশ্নের ধাক্কা সামলাতে ভালই বিব্রত হয়েছিলাম সেদিন।

টেকনাফের পথে আশপাশের পাহাড় দেখতে দেখতে যাচ্ছিলাম। ভোরের নতুন আলোর সাথে সাথে পাহাড়গুলো দেখতে দারুণ লাগছিল আমার। কী সুন্দর দেশ আমাদের!

আমার জন্ম দিনাজপুররের সমতল এলাকায়। সেখানেই বেড়ে ওঠা। আমার কাছে তাই পাহাড়, সমুদ্র, জঙ্গল চির বিস্ময়ের।

পাহাড়ের আড়ালে সূর্যের আলোর লুকোচুরিটা ছিল উপভোগ করার মতো। আর পাহাড়ের শরীর ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা বিদ্যুতের খুঁটিগুলো চোখে পড়ছিল বারবার, চোখে পড়ছিল আদিবাসীদের নানা ধরণ আর গড়নের বাসাগুলো। 

টেকনাফে পৌঁছে ঘণ্টা খানেক বিরতি পেয়েছিলাম। এর মাঝেই সকালের নাসতা সেরে ফেললাম সবাই। তারপর নাফ নদীর পাশে অপেক্ষা করতে লাগলাম জাহাজের জন্য।

Print Friendly and PDF

সর্বাধিক পঠিত
  • আনুমানিক দুইশ বছরের পুরনো আমগাছ

    ঠাকুরগাঁও জেলায় প্রায় দুই বিঘা জুড়ে আছে একটি আমগাছ। দেখলে মনে হয় বিরাট এক আম বাগান। কিন্তু অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, এই মহীরূহের বয়স আনুমানিক দুইশ বছরের কম নয়।

  • ধিক্কার: বঙ্গবন্ধু হত্যার খবরকে অবহেলা করেছিল যারা

    শুধু রাজনীতি নয়, সংবাদপত্রের কাজের সঙ্গেও বঙ্গবন্ধুর সম্পৃক্ততা ছিলো। জীবনের কর্মযজ্ঞে কখনও পত্রিকার মালিক, কখনও সাংবাদিক, কখনও পূর্ব পাকিস্তান প্রতিনিধি, কখনও বা পরিবেশক ছিলেন তিনি। দরকারে হকারিও করেছেন।

  • দৃষ্টিহীনতা দমাতে পারেনি রফিকুলকে

    কুড়িগ্রামের রফিকুল ইসলাম দৃষ্টি প্রতিবন্ধী হয়েও তার ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন। পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর আবর্জনা রিসাইকেল করে তিনি নিত্য ব্যবহারের জিনিস তৈরি করে বাজারজাত করছেন।